নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: টাকার লোভে চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাই নয়। হাওড়া স্টেশন এলাকা এখন ত্রস্ত নেশাখোরদের নিয়ে। নেশার টাকা জোগাড়ে হাওড়া স্টেশনের মতো জনবহুল জায়গায় মুহূর্তে পকেট সাফ করতে সিদ্ধহস্ত তারা। পুলিসি ধরপাকড় যে হয় না, তা নয়। প্রায়ই কেউ না কেউ ধরা পড়ে। তবে তাদের সামলাতে এখন ঘরে-বাইরে রীতিমতো কালঘাম ছুটছে পুলিসের। লক-আপে যাওয়ার পর নেশার টানে দাপাদাপি শুরু করে তারা। দিনভর মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা এই তরুণ-কিশোরদের ‘আইনি বিধানে’ সমাজের মূল স্রোতে ফেরাতে হিমশিম দশা পুলিসের।
কলেবরে বেড়েছে হাওড়া স্টেশন। এই চত্বরের দায়িত্ব গোলাবাড়ি থানার। স্টেশনের নিরাপত্তা সামাল দেওয়ার জন্য আরপিএফ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে জিআরপি। কিন্তু স্টেশন সংলগ্ন গোটা এলাকার দায়িত্ব নিতে হয় গোলাবাড়ি থানাকে। প্রতিদিন কয়েক লক্ষ মানুষের যাতায়াত এই অঞ্চলে। ভিড়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ছিনতাই ও পকেটমারির মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ছিনতাইবাজদের অধিকাংশই কিশোর। বেশ কিছু ভবঘুরেও রয়েছে। গাঁজা, হেরোইনের নেশায় আচ্ছন্ন তারা। পুলিস প্রায়ই তাদের ধরে নিয়ে আসে থানায়। রাতে নেশা কাটতেই সেলের ভিতর দাপাদাপি শুরু করে তারা। পুলিস কর্মীদের একাংশের কথায়, থানায় নিয়ে আসার পর এই তরুণ-কিশোরদের উপর সর্বক্ষণ নজর রাখতে হয়। গভীর রাতে মাদকের নেশা উঠলে কেউ দেওয়ালে মাথা ঠোকে, কেউ হয়তো জিভের নীচে লুকিয়ে রাখা ব্লেড বের করে নিজেরই হাত-পায়ে চালিয়ে দেয়। রক্তারক্তি কাণ্ড হয়। নেশাখোরদের এমন কীর্তিতে মধ্যরাতে জেলা হাসপাতালেও ছুটতে হয় পুলিসকে। আইনজীবীদের একাংশ বলছে, পুলিস লকআপে থাকাকালীন কেউ এমন অঘটন ঘটালে সেটা কর্তব্যরত পুলিস কর্মীদের সার্ভিস রুলবুকের জন্য ঝুঁকিরও বটে।
গত সপ্তাহে হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে উল্টোদিকে কলকাতা বাসস্ট্যান্ডে আসতেই গড়িয়ার বাসিন্দা পেশায় স্কুল শিক্ষক রথীন সান্যাল বুঝতে পারেন, তাঁর প্যান্টের পিছনের পকেটে থাকা মানিব্যাগটি উধাও। শুধু তিনিই নন, সেদিন একই ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন বড়বাজারে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী আশুতোষ বোকারিয়াও। পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, মোবাইল, মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের অভিযোগে প্রায় প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছ’জনকে নিয়ে আসা হয় গোলাবাড়ি থানায়। রাত বাড়লে পিলখানা, ডবসন রোড, স্টেশন সংলগ্ন মাছ-সব্জির বাজার, কলকাতা বাসস্ট্যান্ডের মতো জায়গা থেকে স্টেশনের আশপাশে এসে ভিড় করে তারা। পুলিসের দাবি, তাদের পাকড়াও করে থানায় নিয়ে এলেও অনেক সময় প্রমাণের অভাবে কিংবা অভিযোগ না হওয়ায় ছেড়ে দিতে হয়। আবার ‘আইনি বিধানে’ তাদের হোমে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলেও সমাজের মূলস্রোতে ফেরার মতো নজির একেবারেই কম। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে নেশামুক্তি ঘটানো এবং কাজের মাধ্যমে সামাজিক করে তুলতে ‘শুদ্ধি’ নামের প্রকল্প চালু করেছিল হাওড়া সিটি পুলিস। হাওড়ার বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে নেশাগ্রস্ত কিশোর, তরুণদের হোমে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই প্রকল্প যে উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি, তা নিত্যদিন হাওড়া স্টেশন চত্বরে বেড়ে চলা নেশাখোরদের দৌরাত্ম্যেই স্পষ্ট।