ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলায় একটি বিড়াল! তার আজব কাণ্ডকারখানা জানালেন মৃণালকান্তি দাস।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলায় একটি বিড়াল! তার আজব কাণ্ডকারখানা জানালেন মৃণালকান্তি দাস।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ব্রিটেনে পর পর বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী বদল হয়েছেন। একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন, আবার কিছুদিন পর নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁদের সকলের ঠিকানা হয় লন্ডনের বিখ্যাত ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। প্রধানমন্ত্রী বদলে গেলেও এই বাসভবনের এক সদস্যের কোনও বদল ঘটেনি। ১৪ বছর ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করে চলেছে সে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ছ’জন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ল্যারির। বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিড়াল।
ল্যারি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে ‘চিফ মাউসার টু দ্য ক্যাবিনেট অফিস’ পদে কাজ করছে। ডাউনিং স্ট্রিটের সরকারি ওয়েবসাইটের একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা আছে, ল্যারিই প্রথম বিড়াল যাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিফ মাউসার’-এর উপাধি দেওয়া হয়েছিল। চিফ মাউসার অর্থাৎ প্রধান ইঁদুর শিকারি। এই পদের মূল কাজ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনকে ইঁদুরমুক্ত রাখা। ল্যারি সোশ্যাল মিডিয়াতেও বেশ জনপ্রিয়। এক্স হ্যান্ডলে ‘ল্যারি দ্য ক্যাট’ নামে একটি আন–অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে প্রায় কয়েক লাখ ফলোয়ার আছে তার। এই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায়ই রাজনৈতিক নানা পরিস্থিতি নিয়ে মজার পোস্ট ও মিম শেয়ার করা হয়। তবে এই পেজ কে চালায়, তা এখনও অজানা।
ল্যারি ট্যাবি জাতের বিড়াল। গায়ের রং বাদামি সাদা। ২০১১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ল্যারি কাজ করেছে ডেভিড ক্যামেরন, টেরিজা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক ও কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে। তবে এই মার্জারটি কিন্তু প্রধানমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত পোষা প্রাণী নয়। ডাউনিং স্ট্রিটের কর্মীরাই তার দেখাশোনা করেন। আর ল্যারি ডাউনিং স্ট্রিটে আবাসিক কর্মী হিসেবে থাকে। নতুন প্রধানমন্ত্রী ডাউনিং স্ট্রিটে এলে ল্যারি তাঁকে স্বাগত জানায়। আবার বিদায়ও জানায়।
ব্রিটেনের বিভিন্ন কার্যালয়ে বিড়ালদের দিয়ে ইঁদুর ধরার কাজটা শুরু হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে। তখন থেকেই ব্রিটিশ সরকার ইঁদুর শিকারি ও পোষা প্রাণী হিসেবে একটি করে বিড়াল রাখত। তবে বিড়ালদের এই কাজের রেকর্ড পাওয়া যায় ১৯২০ সালের পর থেকে। ল্যারির আগে আরও অনেক বিড়াল ডাউনিং স্ট্রিটে কাজ করেছে। কিন্তু ল্যারিই প্রথম বিড়াল যাকে ২০১১ সালে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিফ মাউসার’ উপাধি দেয়।
২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে জন্ম নেওয়া ল্যারির জীবনের শুরুটা হয়েছিল রাস্তার বিড়াল হিসেবে। পরে ল্যারির ঠিকানা হয় ব্যাটারসি ডগস অ্যান্ড ক্যাটস হোম নামের আশ্রয়কেন্দ্রে। ২০১১ সালে ল্যারিকে দত্তক নিয়ে আনা হয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। পরিবারের পোষা প্রাণী হিসেবে বড় হতে থাকে বিড়ালটি। দিন দিন তার চলাফেরা ও স্বভাব সবাইকে বেশ আকর্ষণ করে। প্রায়ই তাকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের গেটের সামনে বসে থাকতে অথবা আশপাশে হাঁটাহাঁটি করতে দেখা যায়। ক্যামেরা দেখলেই যেন সে আরও বেশি আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে বসে।
২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিদায় নেওয়ার আগে পার্লামেন্টে দেওয়া শেষ ভাষণে ডেভিড ক্যামেরন স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ল্যারি কোনও ব্যক্তিগত পোষা প্রাণী নয়, বরং সরকারি চাকুরিজীবী। আর এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যিনিই দায়িত্ব নিন না কেন, ল্যারি ডাউনিং স্ট্রিটেই থাকবে। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, ল্যারির সরকারি দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ডাউনিং স্ট্রিটের অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করা। আর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের পুরনো আসবাবগুলি পরীক্ষা করা। ‘চিফ মাউসার’ হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে ল্যারি আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে বেশ কিছু মজার কাণ্ড ঘটিয়েছে। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে আসেন, তখন তাঁদের অভ্যর্থনা জানানোর পাশাপাশি ল্যারি কখনও কখনও এমন কিছু করে বসে যা সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লিমোজিনের নীচে আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ে ল্যারি। এতে অনেকটা সময় দেরি হয়ে যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের। বিড়ালটি কিন্তু খুব সাহসী। একবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে একটি শিয়াল ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, যা ল্যারির পছন্দ হয়নি। সে তৎক্ষণাৎ শিয়ালটির পিছু নিয়ে তাড়া করে। ল্যারির অতর্কিত আক্রমণে ভয় পেয়ে শিয়ালটি দ্রুত পালিয়ে যায়।
ল্যারি সম্ভবত ইঁদুর শিকারের দায়িত্বের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শীঘ্রই অবসর নেবে সে। কারণ, ট্যাবি জাতের বিড়াল সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বাঁচে। ল্যারির বয়স এখন ১৪ বছর। ল্যারির মতো লন্ডনের হোয়াইট হলে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের (এফসিও) প্রধান ইঁদুর শিকারি হল ‘পামারস্টন’ নামে আরেকটি বিড়াল। পামারস্টনের সঙ্গে প্রায়ই মারামারি করত ল্যারি। ২০২০ সালে অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত পামারস্টন এই পদের দায়িত্ব পালন করেছে।