Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ট্রাম্পের কি ‘ডায়ানার স্বপ্ন’ কাটল!

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের যেদিন সিংহাসনে অভিষেক হয়েছিল, গোটা বিশ্বেই সেই দৃশ্য টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচার করা হয়েছিল। সেদিন নিউ ইয়র্ক শহরে বাড়িতে বসে সাদা-কালো টেলিভিশনে মনোযোগ দিয়ে রানির সেই অভিষেকের দৃশ্য দেখেছিল ছ’বছরের একটি ছেলে।

ট্রাম্পের কি ‘ডায়ানার স্বপ্ন’ কাটল!
  • ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের যেদিন সিংহাসনে অভিষেক হয়েছিল, গোটা বিশ্বেই সেই দৃশ্য টেলিভিশনে লাইভ সম্প্রচার করা হয়েছিল। সেদিন নিউ ইয়র্ক শহরে বাড়িতে বসে সাদা-কালো টেলিভিশনে মনোযোগ দিয়ে রানির সেই অভিষেকের দৃশ্য দেখেছিল ছ’বছরের একটি ছেলে।

Advertisement

দিনটি ছিল ১৯৫৩ সালের ২ জুন। ড্রয়িংরুমে ছেলেটির সঙ্গে তাঁর স্কটিশ মা-ও মুগ্ধ হয়ে টেলিভিশনের সামনে বসেছিলেন। সারা দিন। একচুলও নড়েননি। সেই ছেলেটি ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এখন তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। বহু 
বছর পর ট্রাম্পের লেখা ‘দ্য আর্ট অব দ্য ডিল’ বইয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতি তাঁর মায়ের ভালোবাসা সেই ছেলেটির উপর কতটা প্রভাব ফেলেছিল, সে কথা লিখেছিলেন।
সংবাদসংস্থা বিবিসি লিখছে, সম্প্রতি সেই ট্রাম্পের ব্রিটেন সফর নিশ্চিত এক ইতিহাস তৈরি করেছে। কারণ, তিনিই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি ব্রিটেনে দু’টি রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। যার প্রথমটি হয়েছিল ২০১৯ সালে। আগের সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্প উইন্ডসর ক্যাসলে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখন তাঁর মনে নিশ্চয় বারবার তাঁর মা মেরি অ্যান ম্যাকলিওডের ছবি ভেসে উঠেছিল। ট্রাম্পের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা সহযোগী ফিওনা হিল তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন, ট্রাম্প প্রায়ই রাজপরিবারের প্রতি তাঁর মায়ের মুগ্ধতার কথা বলতেন। প্রথম মেয়াদে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করাটা ছিল ট্রাম্পের একটি চরম আকাঙ্ক্ষা। কারণ, এটি ছিল তাঁর ‘এই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্যের প্রতীক’।
ট্রাম্প লিখেছিলেন, তাঁর মায়ের কাছ থেকেই তিনি ‘লোকদেখানো কলাকৌশল’ শিখেছিলেন। তিনি তাঁর মাকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি সবসময় ‘রাজপরিবারের জাঁকজমক, আভিজাত্য ও চাকচিক্যে মুগ্ধ’ থাকতেন। ব্রিটেনে দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফরে ট্রাম্প যখন উইন্ডসরে যান, তখন সেই জাঁকজমক ও আড়ম্বরের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং লোকদেখানোর প্রবণতা পুরোপুরি প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে তাঁকে এতটা উষ্ণ আতিথেয়তা দেওয়া হয়েছে, যেন তিনিই রাজা। যেমন তিনি নিজেকে ভেবে থাকেন। ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে বলেছিলেন, ‘আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম আর ফার্স্ট লেডি মেলানিয়াকে বলছিলাম, ‘তুমি কি কল্পনা করতে পারো, আমার মা এই দৃশ্যটি দেখছেন? এটাই তো সেই উইন্ডসর। উইন্ডসর ক্যাসল!’
ট্রাম্পের কর্মজীবনের শুরুর দিকে যাঁরা তাঁর আশপাশে ছিলেন, তাঁদের মতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের মুগ্ধতায় ট্রাম্প যেন ডুবে থাকতেন। ওয়েস ব্ল্যাকম্যান নামে এক ইঞ্জিনিয়ার ১৯৯০-এর দশকে ট্রাম্পের সঙ্গে ১০ বছর কাজ করেছিলেন। ব্ল্যাকম্যান ট্রাম্পের মার-এ-লাগোকে একটি প্রাইভেট ক্লাবে পরিণত করতে সাহায্য করেছিলেন। ব্ল্যাকম্যানের আজও মনে আছে, ট্রাম্প তাঁর ক্লাবের মেম্বার হিসেবে প্রিন্সেস ডায়ানার নাম ব্যবহার করতেন। যাতে মার-এ-লাগোর প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু সেই সময় আবাসন ব্যবসায়ী ট্রাম্পকে কে চেনে! অনেকেই মনে করতেন, ‘এটা ক্লাবের মেম্বারশিপ বাড়ানোর একটি কৌশল।’ সংবাদসংস্থা বিবিসির দাবি, ট্রাম্প প্রিন্স চার্লসকে মার-এ-লাগোতে এক বছরের জন্য সাম্মানিক সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। উত্তরে চার্লসের পক্ষ থেকে ট্রাম্প একটি চিঠি পান। চিঠিতে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প চাইলে প্রিন্সের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা তহবিলে অনুদান দিতে পারেন। ট্রাম্প সেই চিঠিটিকে একটি ‘দুর্দান্ত চিঠি’ বলে মনে করেছিলেন। সেই চিঠির কথা ব্ল্যাকম্যানেরও মনে আছে। কীভাবে ট্রাম্প সেই চিঠিতে মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন, সেটিও। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সাফল্য এবং ইতিহাসের অংশ হিসেবে পরিচিত হওয়াটা সব সময়ই একটি বড় ব্যাপার ছিল। তিনি তার মধ্যেই বেঁচে থাকতে চান।
১৯৮০-এর দশকে ট্রাম্প যখন নিউ ইয়র্ক শহরে আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন ট্যাবলয়েডগুলিতে খবর প্রকাশ হয়, প্রিন্স চার্লস ও প্রিন্সেস ডায়ানা ট্রাম্প টাওয়ারে ৫০ লাখ ডলার মূল্যের একটি কন্ডো কিনতে আগ্রহী। অনেকেই বলেছিলেন, ট্রাম্প নিজেই সম্ভবত এই গুজব ছড়িয়েছিলেন। পরে সংবাদসংস্থা এপি বাকিংহাম প্যালেসের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছিল। এতে বলা হয়েছিল, ওই প্রতিবেদনের ‘কোনও ভিত্তি নেই’। প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মুখপাত্র ডিকি আর্বিটার বলেছেন,  রাজপরিবারের মাধ্যমে প্রচার পেতে একাংশ যুগ যুগ ধরে এমনটা করে আসছে। তারা আপত্তিকর মন্তব্য করবে এবং যতক্ষণ না তা মানহানিকর হচ্ছে, রাজপরিবার এ নিয়ে কিছু করবে না। তাঁদের মূলমন্ত্র হল ‘কখনও ব্যাখ্যা দিও না, কখনও অভিযোগ করো না।’
ট্রাম্প নিজেই ‘দ্য আর্ট অব দ্য ডিল’ বইয়ে এই ঘটনার উল্লেখ করে লিখেছেন। অবশ্য সেখানে তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেছেন কিছুটা ভিন্নভাবে। ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে একটি ফোন পেয়েছিলেন। ওই সাংবাদিক তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, প্রিন্স চার্লস ট্রাম্প টাওয়ারে কোনও অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন কি না। ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, সেই সপ্তাহে রাজকীয় দম্পতির বিয়ে হয়েছিল। তাঁরা ছিলেন ‘বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দম্পতি’। তিনি এই গুজবটি নিশ্চিত করা বা অস্বীকার করা— কোনও কিছুই করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যমের এই খবরটি ট্রাম্প টাওয়ারের প্রচারে সাহায্য করেছিল।
দুই দশকের বেশি সময় পর ডোনাল্ড ট্রাম্প মেলানিয়া নাউসের সঙ্গে তাঁর বিয়েতে প্রিন্স চার্লসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এই বিয়ে মার-এ-লাগোর ২০ হাজার বর্গফুটের একটি নতুন বলরুমে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আরেকটি রাজপরিবার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ট্রাম্প মার–এ–লাগোর বলরুম তৈরি করেছিলেন। ট্রাম্প তাঁর নিজের ক্লাবের মডেল হিসেবে ভার্সাইয়ের লুই চতুর্দশের ‘হল অব মিররস’কে বেছে নিয়েছিলেন।
রাজপরিবার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টেন মেইনজারের কথায়, ট্রাম্প কয়েক দশক ধরে নিজেকে রাজপরিবারের আদলে গড়ে তোলার এবং নিজের চারপাশে এমন একটি আবহ তৈরির চেষ্টা করেছেন, যেন তিনি অভিজাত শ্রেণির মানুষ। মেইনজার বলেন, ‘ট্রাম্প যখন মার-এ-লাগো কিনেছিলেন, তখন তিনি মূলত আগের মালিকদের কোট অব আর্মস (বংশীয় প্রতীক) গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, যেন তিনি অভিজাত। যেন তিনি কোনও রাজপরিবারের সদস্য। গোটা কর্মজীবনে এটাই করে এসেছেন ট্রাম্প।’ মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী পিটার হ্যারিসের কথায়, ব্রিটিশ রাজপরিবার হল সেই উচ্চ সমাজের শিখর। তাঁদের সঙ্গে থাকার অর্থ স্বীকৃতি ও বৈধতা পাওয়া। ট্রাম্প সব সময় যার অংশ হতে চেয়েছিলেন। কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক হ্যারিস মনে করেন, ট্রাম্প কেবল ট্যাবলয়েড মিডিয়ার মনোযোগ চান। ব্রিটিশ রাজপরিবারের মতো।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় বই ‘দ্য আর্ট অব দ্য কামব্যাক’-এ লিখেছেন, তাঁর একমাত্র ‘আফসোস’ ছিল, তিনি লেডি ডায়ানার সঙ্গে প্রেম করার সুযোগ পাননি। ডায়ানা ছিলেন ‘স্বপ্নের নারী’। বিবিসির সাংবাদিক সেলিনা স্কটের মতে, ১৯৯৬ সালে প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে ডেট করার চেষ্টা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্কট ‘দ্য সানডে টাইমস’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, ডায়ানা তাঁকে বলেছিলেন, ট্রাম্পকে দেখে তাঁর ‘গা ঘিনঘিন করত’। যুবরাজ চার্লসের সঙ্গে বিচ্ছেদের কয়েক মাস পরেই কেনসিংটন প্যালেস (ডায়ানা সেখানেই থাকতেন) বিরাট ফুলের তোড়ায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প! সেই তোড়ার এক একটি ফুলের দামই ছিল একশো পাউন্ড!
ডায়ানার মৃত্যুর কিছুদিন পর ১৯৯৭ সালে বিতর্কিত রেডিও জকি হাওয়ার্ড স্টার্নের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি চাইলে প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে পারতেন। তখনও ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হননি ঠিকই। কিন্তু টেলিভিশন স্টার এবং বিখ্যাত ব্যবসায়ী হিসেবে ট্রাম্পকে তখন প্রায় গোটা আমেরিকাই চেনে। সেই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের যৌন জীবন সংক্রান্ত বিষয়ে রেডিও জকি হাওয়ার্ড স্টার্ন কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। সেই প্রসঙ্গে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ডায়ানা কিছুটা পাগলাটে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওঁর সেই উচ্চতা ছিল, সেই সৌন্দর্য ছিল, গায়ের চামড়াটাও... সব মিলিয়ে উনি অসাধারণ! সুযোগ পেলে ডায়ানাকে নিয়ে বিছানায় যেতে দু’বার ভাবতামও না! ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের আগে তিনি ডায়ানাকে অবশ্য এইচআইভি পরীক্ষা করিয়ে নিতে বলতেন। কোনও মহিলার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের আগে তিনি অবশ্যই সেই মহিলাকে এইচআইভি পরীক্ষা করাতে বলেন, এ কথা ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছিলেন আরও আগের একটি সাক্ষাৎকারে। তবে এখন ডায়ানার সঙ্গে কোনও রোমান্টিক সম্পর্কের আগ্রহের কথা অস্বীকার 
করেন ট্রাম্প।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের অন্য মহিলাদের সম্পর্কেও ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল আরও বির্তকিত। ২০১২ সালে ফ্রান্সে ছুটি কাটাতে গিয়ে সান বাথ নেওয়ার সময় পাপারাজ্জিদের তোলা বর্তমান প্রিন্সেস অব ওয়েলসের টপলেস ছবির জন্য ট্রাম্প তাঁকেই দায়ী করেছিলেন। এমনকী ট্রাম্প ডাচেস অব সাসেক্স মেগানকে ‘ভয়ানক’ ও ‘বাজে’ বলেছিলেন। কারণ, মেগান ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্পকে ‘বিভেদ সৃষ্টিকারী’ ও ‘নারীবিদ্বেষী’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
রানি এলিজাবেথের মুখপাত্র ডিকি আর্বিটারের মতে, এসবের কোনও কিছুই রাষ্ট্রীয় সফরে প্রভাব ফেলে না। রাজপরিবার সব ধরনের নেতাকে আপ্যায়ন করতে অভ্যস্ত এবং অতীতের কোনও মন্তব্য তাঁদের বিচলিত করে না। যথারীতি ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়েছেন। রাজার সঙ্গে ট্রাম্প বেশ খানিকটা সময় কাটিয়েছেন। একসময় ট্রাম্প তাঁর মাকে রাজপরিবারের প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধাশীল হিসেবে দেখেছিলেন। ৭০ বছর পর এখন তিনিই সেই রাজপরিবারের সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রশ্ন একটাই, ট্রাম্পের কি ‘ডায়ানার স্বপ্ন’ কাটল?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ