Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

একহাতেই দশভুজা গড়েন পোলবার ধনঞ্জয়

দশভুজাকে তিনি অবয়ব দেন একহাতে। দশবছর ধরে এভাবেই পুজো মরশুমে এক অজ পাঁড়াগায় চন্দ্রকলার মতো বেড়ে ওঠেন মৃণ্ময়ী।

একহাতেই দশভুজা গড়েন পোলবার ধনঞ্জয়
  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: দশভুজাকে তিনি অবয়ব দেন একহাতে। দশবছর ধরে এভাবেই পুজো মরশুমে এক অজ পাঁড়াগায় চন্দ্রকলার মতো বেড়ে ওঠেন মৃণ্ময়ী। ধনঞ্জয় মিশ্রর ছোট কারখানার সেই মৃৎশিল্প দেখলে বোঝার উপায় নেই, সবটাই একহাতে গড়েছেন শিল্পী। বছর চল্লিশের ধনঞ্জয়ের বামহাত আছে, কিন্তু অসাড়। দেবীর চক্ষুদান থেকে অলঙ্কার নির্মাণ তাই একটি মাত্র হাতের ভরসাতেই করে চলেছেন আমনান পঞ্চায়েতের বীরেন্দ্রনগরের মিশ্রপাড়ার মৃৎশিল্পী। গত কয়েকবছর ধরে অবশ হাত আর কাঁধের কাছে ব্যথা চাগাড় দিয়ে ওঠে। তখন ‘ঘরের দশভুজা’ এসে হাত লাগান। একটু আরাম হয়। দু’জনেরই চোখের জল পড়ে। আকাশপানে অদৃশ্য মৃণ্ময়ীর দিকে হয়তো একটু তাকান। অভিমান হয়। কিন্তু ফের নেশা আর পেশার তাগিদে চোখ মুছে কাজে নেমে পড়েন ধনঞ্জয়। শুধু কপাল ফেরে না। প্রতিমা নিয়ে তারিফ জুটলেও একহাতের শিল্পীকে ভরসা করে কাজ দিতে চায় না অনেক পুজো কমিটি। এবার যদিও দু’টো পুজোয় প্রতিমা গড়ার বরাত মিলেছে। তার একটি থিমের প্রতিমা। দুপুরে সেই প্রতিমার আঙুল গড়ার কাজ করছিলেন ধনঞ্জয়। বলেন, মনের জোরে সবটা করি। একহাতে কাজ করতে হয় বলে শরীরে চাপ পড়ে। ২০১৫ সালের গাড়ি দুর্ঘটনার পর একটা হাত নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তখন মাথায় জোরালো চোট লেগেছিল। কাজ করতে করতে সেই ব্যথা চাগিয়ে ওঠে। তখন ব্যায়াম করতে হয়। একদিন প্রতিমা গড়ার নেশা ছিল। অনটনের সংসারে আজ পেশা হয়েছে। একহাতে আর কি কাজ করব? ওটাই পারি তাই করে যাই। উদাস হয়ে যান শিল্পী। পাশেই বয়ে চলা স্রোতহীন কেদারমতির খালেও বোধ হয় তরঙ্গ জাগে। হাত কয়েক দূরের ভাঙা টালির বাড়ি থেকে ছুটে আসেন স্ত্রী সুদীপ্তা মিশ্র। বলেন, দিনভর ঠাকুর গড়ে রাতে মানুষটা ব্যথায় ঘুমোতে পারেন না। প্রতিদিন যিনি দেবতা গড়েন তাঁকেই দেবতারা অকর্মণ্য করে দিয়েছেন। কাকে আর দোষ দেব!

Advertisement

শুরুটা অবশ্য বিষাদময় ছিল না। ছোট থেকেই প্রতিমা গড়ায় হাত পাকিয়েছিলেন ধনঞ্জয়। ব্রাহ্মণবাড়ির ছেলে যজমানি ছেড়ে পুতুল গড়তে বসলেও পুরোহিত বাবা কিছু বলেননি। উল্টে ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন আকাদেমি অব ফাইন আর্টসে। পড়াশোনার জল বেশিদূর না গড়ালেও আঁকার হাত অনবদ্য ধনঞ্জয়ের। তখন সবে প্রতিমা গড়ায় সুনাম হয়েছে। সদ্য বিয়ে করেছেন। এসেছিল সেই কালো দিন। দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় বামহাতের শক্তি। আর আঁধার ঘনায় জীবনে। এখনও প্রতিমা গড়ার সঙ্গে আঁকা শিখিয়েই তাঁর সংসার চলে। নিচু হয়ে আসা বাড়ির চাল সোজা করা হয়নি বহুকাল। ভাঙাচোরা ঘর থেকে চাতালে ছড়িয়ে পড়ে থাকে তেল রং, অ্যাক্রোলিকে আঁকা সুদৃশ্য ছবি, প্রতিমার ছাঁচ, গয়নার সম্ভার। এক সোনালী অতীতের বিকৃত ছবি। হাহাকার করেন ধনঞ্জয়। আবারও জল নামে চোখ ঠেলে। আবারও আসেন দশভুজা। মাটির নয়, ঘরের, মানবী।  নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ