


কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: গত বিধানসভা ভোটের আগে নিউটাউনে মতুয়া নবীন বিশ্বাসের বাড়ি তৃপ্তি করে খেয়ে অমিত শাহ বলে গিয়েছিলেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমি আছি, মোদিজি আছেন, বিজেপি আছে। আপনারা নাগরিকত্ব পাবেনই।’ সাড়ে চার বছরও কাটল না। এসআইআরে ছ’হাজার মতুয়ার নাম কাটা পড়ল শুধু নিউটাউনে। মিত্র যদি মিরজাফর হয়, তাহলে মনে আঘাত লাগে বেশি। নবীনরাও হতবাক, ক্ষুব্ধ, বিচলিত এবং আতঙ্কিত। নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি মিথ্যে হওয়ার পর দুশ্চিন্তা বেড়েছে। ভাবছেন, এ দেশে থাকতে পারবেন তো? অসমের মতো ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেবে না তো? পুশব্যাকের নামে নৌকায় ভাসিয়ে অন্য দেশে পাঠানোর চক্রান্ত করবে না তো? যে অতিথি হয়ে এসে মিরজাফরের মতো পিঠে ছুরি মারে, তারা সব করতে পারে।
জানুয়ারিতে ভোটার দিবসে প্রকাশিত তথ্য অনুয়াযী, রাজারহাট-নিউটাউন বিধানসভার ভোটার সংখ্যা ৩ লক্ষ ২৫ হাজার ৯২৮। তারপর শুরু হয় এসআইআরের কাটাছেঁড়া। ফলে পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও মেলেনি। জানা গিয়েছে, কমবেশি ১৪ হাজারের মতো নাম কাটা পড়েছে। সংযোজন-বিয়োজন পর্ব এখনও শেষ হয়নি। ওই ৩ লক্ষ ২৬ হাজারের মধ্যে ৪০ হাজারই হলেন মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। নাগরিকত্বের টোপ এঁদের সামনে বহু আগেই ঝুলিয়েছিল বিজেপি। এসআইআরে সে টোপের ফানুসটা ফুটো হয়ে সত্যিটা বেরিয়ে এসেছে। যদিও ফানুস ফাটার আগে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে ৪০ হাজার ভোটের লোভে অমিত শাহ এখানে আসেন। নবীন বিশ্বাসের বাড়ি ছোলার ডাল-ধোকলা-নতুন গুড়ের পায়েস দিয়ে গরম গরম রুটি খান। এবং নাগরিকত্বের গাজর ঝুলিয়ে বিদায় নেন। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা স্বাভাবিকভাবেই তখন বিশ্বাস করেছিলেন নবীনবাবুরা। এখন মিরজাফরের রূপ সামনে আসার পর ক্ষুব্ধ এবং দেশ থেকে বিতারিত হওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা আতঙ্কিত।
নবীন বিশ্বাস বর্তমানে অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসংঘের কার্যকরী সভাপতি পদে রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলে উদ্বাস্তু হয়ে আসা প্রায় ৬০ হাজার (রাজারহাট-নিউটাউন ৪০ হাজার, গোপালপুর-নিউটাউন ১৮ হাজার, বিধানননগর ২ হাজার) মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। আমাদের মোহভঙ্গ হয়েছে। অমিত শাহ তো বটেই, মতুয়া বাড়ির শান্তনু ঠাকুর আমাদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর ভূমিকারও আমরা কঠোর সমালোচনা করছি।’ তিনি জানান, নাম বাদ যাওয়া শুধু নয়, এসআইআর মতুয়াদের জীবনটাই বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। ধরুন, একটি পরিবারের মা-বাবার নাম রয়েছে তালিকায়। অথচ তাঁদের তিন সন্তানের নাম কাটা পড়েছে। তাহলে কি সন্তানদের পাঠানো হবে ডিটেনশন ক্যাম্পে, বা পুশব্যাক করা হবে? আর মা-বাবা থেকে যাবেন এদেশে? মতুয়াদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি ব্যবস্থা।
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘যার শিল যার নোড়া, তারই ভাঙি দাঁতের গোড়া।’ শিল-নোড়ায় বহু যত্ন করে মশলা বেটে রান্না করেছিলেন নবীনবাবুর স্ত্রী সুচন্দ্রাদেবী ও বউদি দুলালিদেবী। কিন্তু নোড়ার পালটা আঘাতে মতুয়াদের জীবন প্রায় থেঁতো করে পিষে মারছে বিজেপি। সাধারণ মানুষ চিরকাল ভোটকে নিজের প্রতিবাদের অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছেন। ২৯ এপ্রিল নিউটাউনে ভোট দেবেন সেই মানুষরাই।