বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: দুই সন্তানের মধ্যে গর্ভেই মৃত্যু হয়েছিল একজনের। সেই ভ্রুণ শুধু মারাই যায়নি, তার দোসর ও মায়ের জীবনকেও ফেলে দিয়েছিল ঝুঁকির মুখে। সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে মা ও তার যমজ বোনকে সেই বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তাররা।
সন্তানসম্ভবা নাফিসা বেগম (নাম পরিবর্তিত) দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা। ১৯ বছরের এই তরুণী গর্ভধারণের পর স্থানীয় চকবোরলি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গর্ভাবস্থার ১১ সপ্তাহে প্রথমবার এবং ১৫ সপ্তাহের মাথায় দ্বিতীয়বার চেক আপ করান। দু’বারই ডাক্তারি পরীক্ষায় জীবিত যমজ সন্তানের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এর প্রায় আড়াই মাস বাদ তৃতীয় চেকআপের জন্য তিনি আসেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে। গর্ভের যমজ সন্তানদের বয়স তখন ছ’মাস পেরিয়ে গিয়েছে। তবে তাদের মধ্যে একজনের নড়াচড়া টের পেলেও অন্যজনের অস্তিত্ব বুঝতে পারছিলেন না প্রসূতি। ইউএসজি এবং নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায়, শুরুতেই একটি ভ্রুণের মৃত্যু হয়েছে। এরপরই শুরু হয় লড়াই। মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রক্ত, রক্তরস এবং খাদ্যবস্তু পচতে শুরু করে মৃত ভ্রুণের শরীরে। ক্রমে তা মা ও দ্বিতীয় ভ্রূণের শরীরে মেশার উপক্রম হয়। ডি ডাইমার ও রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট উদ্বেগজনক আসে। যা চিন্তায় ফেলে ডাক্তারদের। শেষ পর্যন্ত নিয়মিত চেক-আপ, প্রয়োজনী সতর্কতা, ওষুধ এবং সেবাযত্নে ৩৪ সপ্তাহের মাথায় সুস্থ সন্তান প্রসব করেন নাফিসা। সন্তানের ওজন প্রায় দু’কেজি। তবে মৃত ভ্রূণটিকে পাওয়া গিয়েছে কাগজের মতো পাতলা অবস্থায়। যেন পার্চমেন্ট পেপার! সেটি এক অদ্ভুত আকার নিয়ে অবস্থান করছিল প্লাসেন্টার ভিতরে। ন্যাশনালের স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রেগন্যান্সিতে এটি একটি বিরল সমস্যা। ডাক্তারি পরিভাষায় এর নাম ‘ফিটাল পেপিরাসিয়াস’। এক্ষেত্রে মাতৃগর্ভে মৃত ভ্রুণের অবস্থা হয়ে যায় কাগজের মতো!
‘ভ্যানিশিং টুইন সিনড্রোম’ নামে এরই কাছাকাছি আর এক ধরনের সমস্যায় গর্ভেই মৃত ভ্রুণের কোষ, কলা, শরীর আত্তিকরণ করে নেয় মা। সেক্ষেত্রে অনেকটাই নিরাপদে থাকে যমজের জীবিত সহোদর বা সহোদরা। এক্ষেত্রে তা না হওয়ায় দ্বিতীয় সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল দু’জনের। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, প্রতি ১২ হাজার প্রসবে বা প্রতি ১৮৪টি যমজ সন্তান প্রসব পিছু একজনের ফিটাল পেপিরাসিয়াস হয়।
ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ডাঃ পি কে বিশ্বাস, অধ্যাপক ডাঃ পি পি শর্মা, ডাঃ বিশ্বপ্রতাপ দাস সহ সিনিয়র ও জুনিয়র ডাক্তারদের একটি যৌথ টিম জটিল পরিস্থিতিকে সহজ করেন। ইউনিট ইনচার্জ ডাঃ শর্মা বলেন, গর্ভে প্রথম সন্তানের মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত। এর দু’টি কারণ হতে পারে। এক, ক্রোমোজোমের গঠনগত ত্রুটি। দুই, প্লাসেন্টার মধ্যে রক্তবাহী নালি পেঁচিয়ে গিয়ে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এই ধরনের ঘটনা ধরা পড়লে প্রসবের আগে পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে চেকআপ করাতে হয়। এমনকী, দ্বিতীয় সন্তানটি নিরাপদে প্রসবের পরেও শিশুটির ফলোআপ জরুরি। নাফিসা অক্ষর অক্ষরে আমাদের পরামর্শ শুনেছেন। তাই মা ও দ্বিতীয় সন্তানকে বড় বিপদ থেকে বাঁচানো গিয়েছে।