নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান ও কলকাতা: প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজকে অন্যায়ভাবে সুবিধা পাইয়ে দিতে এক প্রবীণ সরকারি চিকিৎসক ঘুষ নিচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁকে হাতেনাতে পাকড়াও করল সিবিআই। শনিবার রাতে রীতিমতো ঘুঁটি সাজিয়ে কলকাতার গিরিশ পার্কের বাড়ি থেকে সিবিআই গ্রেপ্তার করে প্রফেসর ডাঃ তপনকুমার জানাকে।
সিবিআই সূত্রের দাবি, ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় ওই চিকিৎসককে ধরা হয়েছে। প্রায় একই সময়ে তদন্তকারীদের একটি দল বর্ধমান শহরের মিঠাপুকুরে চিকিৎসকের বাড়িতে পৌঁছে যায়। রাত ১১টা থেকে রবিবার সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পাঁচ সদস্যের দল তল্লাশি চালিয়ে ৪৪ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করে। এর সঙ্গে ঘুষের ১০ লক্ষ ধরলে মোট উদ্ধার হওয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ৫৫ লক্ষ টাকা (৫৪.৬)। এছাড়া, ধৃতের বর্ধমানের বাড়ি থেকে কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, বিভিন্ন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের কাগজপত্র মিলেছে। ধৃতের স্ত্রীও একজন সরকারি চিকিৎসক। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জানার চেষ্টা করেন, কোথায় কোথায় তাঁদের কত সম্পত্তি রয়েছে। তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকউন্টে সম্প্রতি কত টাকার লেনদেন হয়েছে, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের প্রধান তপনবাবু ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের (এনএমসি) অ্যাসেসর বা মূল্যায়নকারী হিসেবে বিভিন্ন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে পরিদর্শনে যেতেন। অভিযোগ, কর্ণাটকের বেলগাঁওয়ের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের পক্ষে ‘ফেভারেবল’ রিপোর্ট দেওয়ার জন্য তিনি ১০ লক্ষ টাকা দাবি করেন। নির্দিষ্ট ‘ইনপুট’-এর ভিত্তিতে সিবিআই এই চিকিৎসক সহ বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দুই আধিকারিকের বিরুদ্ধে শনিবারই এফআইআর করে। কর্ণাটকের ওই কলেজের প্রতিনিধি হিসেবে এক ব্যক্তি যখন গিরিশ পার্ক এলাকায় ডাঃ জানার বাড়িতে তাঁকে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ দিচ্ছিলেন, তখনই হাজির হন গোয়েন্দারা। নগদ টাকা ছাড়াও প্রচুর সোনার গয়না ও মূল্যবান রত্ন পাওয়া গিয়েছে। তার নথিপত্র খুঁজছে এজেন্সি। রবিবার ডাঃ জানাকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁকে তিনদিনের ট্রানজিট রিমান্ডে দিল্লিতে সিবিআইয়ের সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। গ্রেপ্তারির বিষয়টি এনএমসি এবং স্বাস্থ্যদপ্তরকে জানানো হয়েছে।
তপনবাবুর স্ত্রী আরামবাগ মেডিক্যাল কলেজে কর্মরতা। তিনি বলেন, ‘শনিবার রাতে পাঁচজন আধিকারিক সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে বাড়িতে আসেন। সঙ্গে দু’জন পুলিস আধিকারিকও ছিলেন। তাঁরা তল্লাশি চালান। যাওয়ার সময় হার্ডডিস্ক এবং বেশ কিছু নথি নিয়ে গিয়েছেন।’ স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ৪৮ ঘণ্টা পুলিস বা সরকারি এজেন্সির হেফাজতে থাকলে সেই কর্মী বা অফিসারকে সাসপেন্ড করাই নিয়ম। এক্ষেত্রেও সেইমতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্রে খবর, ডাঃ জানা মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পোস্টিং থাকলেও সপ্তাহের অর্ধেক দিনই তিনি বর্ধমানে থাকতেন। শহরের নার্সিংহোমে অপারেশন করতেন। অ্যানাটমি বিভাগে কাজ করলেও বর্ধমানে তিনি গাইনোকোলজিস্ট হিসেবে পরিচিত। এমনকী, প্রসূতিদের সিজারও করতেন। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ থেকে কিছুটা দূরে মিঠাপুকুরে তাঁর প্রাসাদোপম বাড়ি। সেখানে তাঁর স্ত্রী, ছেলে এবং শাশুড়ি থাকেন। এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, ওই চিকিৎসক পাড়ার কারও সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। মাঝেমধ্যেই বিদেশে ঘুরতে যেতেন তাঁরা।