ধনতেরস মূলত অবাঙালি উৎসব হলেও এখন বাঙালির তেরো পার্বণের তালিকায় ঢুকে পড়েছে। এই উৎসব কীভাবে উদ্যাপন করবেন, বললেন টলিপাড়ার নায়িকারা। শুনলেন প্রিয়ব্রত দত্ত।
ধনতেরস মূলত অবাঙালি উৎসব হলেও এখন বাঙালির তেরো পার্বণের তালিকায় ঢুকে পড়েছে। এই উৎসব কীভাবে উদ্যাপন করবেন, বললেন টলিপাড়ার নায়িকারা। শুনলেন প্রিয়ব্রত দত্ত।
দেবশ্রী রায়
এই মুহূর্তে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত আমি। পরপর তিনটে মৃত্যু। ২২-এ ভাই, ২৪-এ মা। গত জুলাই মাসে দিদিও চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মৃত্যুর মিছিল যেন। এ বছর তাই কোনও উৎসবেই শামিল হতে ইচ্ছে করেনি। মনে পড়ছে ধনতেরস নিয়ে মায়ের উৎসাহ, আগ্রহের দিনগুলো। এবার মা নেই। তাই ধনতেরস নিয়ে মাতামাতিও নেই। আমার মেজদি মানে রানি মুখোপাধ্যায়ের মা প্রতি বছর ধনতেরসের আগে কলকাতায় চলে আসত। মাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বাসনপত্র কিনত। মাকেও কেনাত। আসলে ধনতেরস তো ঠিক বাঙালিদের উৎসব ছিল না। মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ ওই সব জায়গায় ধনতেরস বড় উৎসব। মেজদি মুম্বইয়ে থাকত। সেই সূত্রে সেখানকার নানা রীতি, রেওয়াজ, পুজো-অর্চনা সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আচার আয়োজনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। মূলত মেজদির উদ্যোগ উৎসাহেই আমাদের পরিবারে ধনতেরস পালন করা হয়। প্রথম দিকে আমার অত উৎসাহ ছিল না। সব বার তো আর মেজদি ধনতেরসের সময় কলকাতায় আসতে পারত না। সেই বছরগুলোয় মেজদির তাগাদায় আমি মাকে নিয়ে যেতাম ধনতেরসের তিথিতে বাসন কিনতে। ক্রমে ক্রমে আমারও অভ্যাস হয়ে গেল। বাসনই কিনি। কোনও কোনও বছর মেজদির কথায় হয়তো রুপোর কয়েন কিনেছি। ধনতেরসে কখনও সোনা কিনিনি।
ঈশা সাহা
ধনতেরস, এই উৎসবটা আমার খুব ভালো লাগে। খুব ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। আমরা বাঙালিরা তো সবকিছু নিজের করে নিতেই ভালোবাসি। তাই ধনতেরসও আমাদের অন্যতম পার্বণ হয়ে গিয়েছে। যেমন ক্রিসমাস বা ঈদ। আগে কি এত গণেশ পুজো হতো আমাদের এখানে? ধনতেরস উপলক্ষ্যে আমি নিজে হয়তো কিছু কিনি না, বাড়ির কর্ত্রী হিসেবে মা প্রতি বছর নিয়ম করে কিছু একটা কেনেন। আমি অবশ্য বছরের যেকোনও সময়ই কিছু না কিছু গয়না কিনি। ভালোবাসার জিনিস একদিন কেন সব সময়ই কেনা যায়। আগে আমার এত গয়না প্রীতি ছিল না। ইদানীং একটি অলঙ্কার প্রস্তুতকারী সংস্থার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হয়ে একটু একটু করে গয়নার প্রেমে পড়েছি। তাছাড়া আমি ভীষণ শাড়ি পরতে ভালোবাসি। শাড়ির সঙ্গে মানানসই হালকা গয়না পরতে পছন্দ করি। শাড়ি ছাড়াও ওয়েস্টার্ন কিছু আউটফিটের সঙ্গে খুব সাধারণ কোনও স্টেটমেন্ট হয়তো পরলাম। এখন হালকা গয়নার প্রতি আমার আগ্রহ বাড়ছে। তবে এটা নয় যে মা ধনতেরাসের নামে আমার পছন্দ অনুযায়ী কিছু কিনলেন। সব সময় সোনা কেনেন, তাও নয়। পুজোর রীতি মেনে রুপোর কয়েনও কেনা হয়। শ্যুটিং বা অন্য কোনও কাজ না থাকলে মায়ের সঙ্গে ধনতেরসের কেনাকাটা করতে বেরিয়ে পড়ি।
দেবলীনা কুমার
ধনতেরসে আমি প্রতি বছর রুপোর কয়েন কিনি। এই অভ্যাসটা আমার সেই ছোটবেলা থেকে। মাকে দেখে শিখেছি। আমার মা খুব মুক্ত মনের মানুষ। নানান উৎসবে শামিল হতে ভালোবাসেন। মায়ের সঙ্গে যেতাম। তখন আমি স্কুল ছাত্রী। মায়ের দেখাদেখি আমারও ধনতেরসে রুপোর কয়েন কেনার বাসনা জাগে। সারা বছর হাত খরচ বাঁচিয়ে সেই টাকায় আমিও ধনতেরাসে একটা রুপোর কয়েন কিনতাম। সেই অভ্যাসটা আজও রয়ে গিয়েছে। তখন অবশ্য এখনকার মতো ধনতেরস ঘিরে এত উদ্দীপনা, আগ্রহ ছিল না। বাঙালি বরাবরই হুজুগে জাতি। কোনও না কোনওভাবে মানুষের আনন্দে থাকার একটা উপলক্ষ্যের দরকার হয়। যতদিন না নিজেদের সংস্কৃতি ভুলে যাচ্ছি, ততদিন অন্যের উৎসবকে আপন করে নিতে কোনও অসুবিধা নেই। ইতিহাসেও দেখেছি আমরা অপরকে আপন করে নিতে ভালোবাসি। সে উৎসব হোক, খাবার দাবার হোক, জামাকাপড় হোক। মুক্তমনটাই তো বাঙালির সম্পদ। অনেকে বাসনপত্র কেনেন। আমি কিনি না। সারা বছরই কিছু না কিছু সোনাদানা কিনলেও ধনতেরসে আমি ওই রুপোর কয়েনই কিনি।
দিব্যানী মণ্ডল (ফুলকি)
আমার জন্ম বেড়ে ওঠা মুর্শিদাবাদে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস সেখানে। ফলে বিচিত্র রকম সংস্কৃতি, রীতি রেওয়াজ, আচার, অনুষ্ঠানের মধ্যে আমি বড় হয়েছি। ঈদে স্কুলের বন্ধুদের বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে যাচ্ছি আবার দুর্গা পুজোয় খিচুড়ি, পায়েস, মাছ, মাংস খেয়ে হজম হতে হতেই ছট পুজোয় ঠেকুয়া খাচ্ছি। ওঁদের পুজোয়, উৎসবে আমিও বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে মজা করছি। তাই ধনতেরস আমার কাছে পাড়ার আর পাঁচ জন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মতো খুবই স্বাভাবিক আর ঘরোয়া একটা অনুষ্ঠান। ছোট থেকেই দেখতাম মা ধনতেরসের দিন সংসারের শুভ কামনায় কিছু না কিনছেন। তা সে সোনাদানাই হোক কিংবা রুপোর কয়েন, বাসনপত্র ইত্যাদি। গত বছর থেকে আমিও ধনতেরস উপলক্ষ্যে জিনিস কিনতে শুরু করেছি। শ্যুটিং থাকায় আমি অবশ্য নিজে মুর্শিদাবাদ গিয়ে কিছু কিনতে পারিনি। মাকে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। মা আমার নাম করে জিনিস কিনেছেন। গয়না আমার খুব একটা পছন্দের জিনিস নয়। ভারী গয়না তো নয়ই। নর্মাল জুয়েলারিই পরি। খুব হালকা। যে জামাকাপড়ের সঙ্গে যে ধরনের গয়না মানায় তেমনই। এবছরও তাই ধনতেরসে নিজের জন্য অলঙ্কার না কিনে পুজোয় নিবেদন করা যাবে এমনই কিছু একটা কেনার ইচ্ছে আছে।
সুস্মিতা দে (কথা)
আমার বেশ দারুণ লাগে। ধনতেরস উপলক্ষ্যে কিছু কেনাটা বেশ ইন্টারেষ্টিং। কিছু একটা নতুন জিনিস ঘরে আসছে। খুব আনন্দের। ছোটবেলা থেকেই মায়ের সঙ্গে ধনতেরসের দিন জিনিস কিনতে বেরতাম। এখন অবশ্য শ্যুটিং থাকে বলে আর সময় পাই না। রুপোর কয়েন, সোনার অলঙ্কার যখন যেমন পছন্দ হয় মা, আমি সেটাই কিনি। আমি অবশ্য বলতে গেলে একদমই গয়না পরতে পছন্দ করি না। খুব জোর হালকা, স্লিক আংটি অথবা ছোট্ট কানের দুল। ব্যাস। শাড়ির সঙ্গেও ওই আংটি, দুল ছাড়া কিছু পরি না। মা-ও তাই ধনতেরসে ভারী গয়নাগাটি কিছু কেনেন না। সংসার বা পরিবারের মঙ্গলের জন্য ঘরে কিছু একটা নতুন জিনিস আসছে এটাতেই আমার আনন্দ। আগে ধনতেরস নিয়ে বাঙালিদের মধ্যে এতটা উৎসাহ ছিল না। এখন বেড়েছে। এটাকে আমি ঠিক হুজুগ বলব না। বলব সমস্ত ভালো ও শুভ জিনিসের প্রতি বাঙালির স্বভাব জাত আগ্রহ, উৎসাহ ও আপন করে নেওয়ার প্রবণতা। ভালোই তো, ধনতেরস উপলক্ষ্যে ডিসকাউন্টের সুযোগে ভবিষ্যতের জন্য কিছু তো সঞ্চয় করে রাখা গেল আবার সংসারের মঙ্গলও হল।
সন্দীপ্তা সেন
আমার ছোটবেলা কেটেছে ভবানীপুরে। ওখানে যেমন প্রচুর অবাঙালির বসবাস, তেমনই সোনা ও রুপোর দোকানের রমরমা। ফলে সেই শিশু বয়স থেকেই ধনতেরস উৎসবটার সঙ্গে আমি পরিচিত। মা প্রতি বছরই ধনতেরস উপলক্ষ্যে কোনও না কোনও ধাতুর জিনিস কিনতেন। আমিও সঙ্গে যেতাম। আমার বেশ ভালো লাগে এই উৎসবটা। পরে বড় হয়ে রোজকার করতে শিখে আমিও ধনতেরসে ধাতুর জিনিস কিনতে শুরু করি। তবে খুব ছোটখাট, হালকা অলঙ্কারই কিনি। এই যেমন কানের দুল বা ছোট সেট। আসলে আমি খুবই হালকা গয়না পছন্দ করি। একটু অন্যরকম দেখতে হবে। পুরনো দিনের সাবেকি হালকা ডিজাইনের অলঙ্কার ও পরি। আগে এই উৎসবটা মূলত অবাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন বিজ্ঞাপন আর প্রচারের অভিনবত্বে, বাণিজ্যিক কৌশলে ব্যাপকতা পেয়েছে। এখন ব্যক্তিগতস্তরে ফোন করে নিমন্ত্রণ করার চলও হয়েছে। আর বাঙালি তো হুজুগেই। নতুন কিছু একটা পেলেই সেটা আপন করে নিয়ে মেতে ওঠে। আমি তোএই উদ্যাপনের মধ্যে সদর্থক দিকটাই দেখতে পাই। এবার ধনতেরসে আমি কিছু কিনতে পারব না। হিন্দি সিরিয়ালের শ্যুটিংয়ে এই মুহূর্তে চণ্ডীগড়ে আছি এইসব শহরে খুব ধুমধাম করে ধনতেরস উদযাপন করা হয়, কিন্তু আমরা একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শ্যুটিং করছি, সেখানে উৎসবের আঁচ পাওয়া মুশকিল। নভেম্বরে ফিরব। তখন ধনতেরসের নাম করে কিছু একটা কিনব।