


‘এই কদিন আগেই দেখা হয়েছিল, নামও বলেছিল। আজ ফের দেখা। ওই ভদ্রলোক আমার নাম ধরে ডাকলেন, কিন্তু ওঁর নাম মনে নেই আমার!’— এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে নিশ্চয় সকলেই পড়েছেন। প্রশ্ন হল, কীভাবে অন্যের নাম মনে রাখবেন? বিস্তারিত জানতে পড়ুন প্রবন্ধটি। আলোচনায় সল্টলেক মাইন্ডসেট ক্লিনিকের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
এই যে ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা, বিশেষ করে নাম ভুলে যাওয়া—এটা কিন্তু খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা। এই বিষয়টির সঙ্গে সবসময় ডিমেনশিয়ার সম্পর্ক থাকে না। সবচেয়ে মজার কথা হচ্ছে, নাম ভুলে যাওয়ার এই প্রবণতা যে শুধু বেশি বয়সে হবে বা বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হবে, তা কিন্তু নয়। এক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা ছাত্রদের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছিল, তারা তাদের সহপাঠীদের নামও অনেক সময় ঠিকঠাক বলতে পারেনি।
কাজেই নাম মনে করতে না পারা একটা সহজাত প্রবণতা। কোনো নাম মনে রাখার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ ধৈর্য বা মনোযোগ দরকার, সেটা হয়তো অনেকে সবসময় দিয়ে উঠতে পারেন না। নাম ভুলে যাওয়ার পেছনে আমরা মূলত কয়েকটি কারণ খতিয়ে দেখতে পারি।
মনোযোগের অভাব: প্রথমত, আমরা যদি খুব মন দিয়ে সামনের মানুষটির বা যে মানুষটির সঙ্গে সদ্য পরিচয় হল, তার নাম না শুনি, তবেই সমস্যাটা হয়।
বিকল্প আকর্ষণ: দ্বিতীয়ত, নামের চাইতেও ওই মানুষটির অন্য কোনো বিষয়ে বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে যা আপনাকে প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে তার প্রফেশন, তার বাড়ির ঠিকানা ইত্যাদি।
স্মৃতি ভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা: তৃতীয়ত, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের ‘স্টোর’ অনেকখানিই পূর্ণ হয়। কারণ সারা জীবনে ধরেই অসংখ্য বিষয় আমাদের মনে রাখতে হয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই বেশ কিছু নাম স্মৃতি ভাণ্ডার থেকে ‘ডিলিট’ হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতাও আস্তে আস্তে কমতে থাকে।
কখন বিষয়টি চিন্তার বা অস্বাভাবিক?
এবার প্রশ্ন হলো, এই নাম মনে রাখতে না পারার বিষয়টি কখন অস্বাভাবিক? যদি শুধু কোনো ব্যক্তির নাম নয়, বরং কোনো নিত্য ব্যবহৃত জিনিসের নাম মনে করতেও সমস্যা হয়, তবে আমাদের একটু নড়েচড়ে বসতে হবে। এর সঙ্গে যদি আরও কিছু আনুষঙ্গিক উপসর্গ থাকে, তবে বুঝতে হবে সেটা স্বাভাবিক নয়। যেমন—
১. শব্দ খুঁজে না পাওয়া: কোনো একটি শব্দ মনে করতে না পেরে খুব কাছাকাছি কোনো শব্দ দিয়ে সেটাকে ব্যাখ্যা করার প্রাণপণ চেষ্টা করা। যেমন অনেক ডিমেনশিয়ার রোগী এভাবে বলেন— “ওই যে, ওই যে যেটা দিয়ে জল ঢালি গো!” অর্থাৎ তিনি ‘মগ’ বলতে চাইছেন কিন্তু নামটা পেটে আসছে তো মুখে আসছে না।
২. কনফ্যাবুলেশন: কোনো ব্যক্তির নাম, পশুপাখি, প্রিয় পোষ্য বা নিত্য ব্যবহৃত জিনিসের নাম ভুলে গিয়ে অন্য কোনো একটা নাম মাথায় যা আসছে সেটা দিয়েই ‘মেকআপ’ দিয়ে দেওয়া। এই জায়গাটাকে অনেক ক্ষেত্রে ‘কনফ্যাবুলেশন’ বলে। বিয়টা ডিমেনশিয়ার চিহ্ন হতে পারে।
৩. স্মৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রভাব: যদি দেখা যায় নাম মনে করার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য স্মৃতির জায়গাগুলোও অনেকটা প্রভাবিত হচ্ছে, তবে বুঝতে হবে সেটা স্বাভাবিক লক্ষণ নয়।
পরীক্ষা ও শারীরিক কারণ
এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু অ্যাসেসমেন্ট হওয়া দরকার। যেমন—
এমএমএসই (মিনি-মেন্টাল স্টেট এগজামিনেশন)
এমওসিএ (মন্ট্রিল কগনিটিভ অ্যাসেসমেন্ট)।
এই ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যায়, শুধু নাম নয়, মস্তিষ্কের অন্যান্য জায়গাতেও সমস্যা হচ্ছে কি না। যদি নিত্য ব্যবহৃত জিনিসের নাম মনে রাখতে সমস্যা হয়, তবে তাকে নমিনাল এফাসিয়া (নমিনাল এফ্যাসিয়া) বলা হয়। সেক্ষেত্রে শুধু ডিমেনশিয়া নয়, ব্রেইন স্ট্রোক, টিউমার বা কিছু ক্ষেত্রে পারকিনসনস-এর মতো সমস্যার কথাও মাথায় রাখতে হবে।
আরও একটি বিষয় হল, বহু ক্ষেত্রে দেখা যায় নাম ভুলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে সেটি মনে পড়ে গেল। এর মানে হলো, ওই সময়টুকুতে মস্তিষ্ক প্রাণপণ তার ‘ফাইল ক্যাবিনেট’ হাতড়ে চলছিল নামটাকে খুঁজে বের করার জন্য। হঠাৎ করে সেটা মাথায় চলে আসা একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হতে পারে।
নাম মনে রাখার প্রক্রিয়া
অল্প বয়সিদের ক্ষেত্রেও যদি নাম মনে না পড়ে, তবে মনে রাখতে হবে যে মস্তিষ্ক সেটাই মনে রাখতে পারে যে বিষয়টার সঙ্গে কোনও অভিজ্ঞতা জুড়ে থাকে। তাই কোনও ব্যক্তি নাম বললে ওই নামের সঙ্গে বা মানুষটির সঙ্গে কেন্দ্র করে আরও আনুষঙ্গিক বিষয় জিনিস জুড়ে দিতে হয়। তবেই সেই নাম একটা গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে মস্তিষ্কের মধ্যে পাকাপাকিভাবে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’ বাস করে। এই কারণেই যদি খুব ক্যাজুয়ালি কারও সঙ্গে আলাপ হয় এবং কোনো সংযোগ তৈরি না হয়, তবে সেই নাম স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে না। তাই কেউ নাম বললে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত ভালোলাগা মন্দ লাগা জুড়ে দিতে পারেন যেমন, কেউ কারও নাম অঞ্জন বললে আপনি খেয়াল করে দেখুন আপনার পরিচিত আর কে কে অঞ্জন আছে, কেউ না থাকলে অঞ্জন নামের অর্থ জিজ্ঞাসা করুন। এক্ষেত্রে যেমন অঞ্জন নামের অর্থ চোখের কাজল। ফলে তার নাম আর আপনি ভুলবেন না।
লিখেছেন: সুপ্রিয় নায়েক