


বইয়ের সঙ্গে তুলনা কখনও সম্ভব? কিন্তু, এক দশক আগেও যে বাঙালি বই পড়ায় ছিল আচ্ছন্ন, তাকেই আজ ভূতে পাওয়ার মতো পেয়েছে রিলস-এ! এইবারের স্বাস্থ্যকর বিতর্কে অংশ নিলেন বিশিষ্ট মনোবিদ ডঃ অমিত চক্রবর্তী ও বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আশিস মুখোপাধ্যায়। বই পড়ার গুণাগুণ নিয়ে বললেন ডঃ চক্রবর্তী। রিলস-এর ভালোমন্দের ব্যাপারে মুখ খুললেন ডাঃ মুখোপাধ্যায়।
৩২ লাখ। কদিন আগে শেষ হওয়া কলকাতা বইমেলায় মোট এত সংখ্যক মানুষ এসেছিলেন, যা একটা রেকর্ড। হিসাব বলছে, ১৩ দিনে মোট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩২ কোটি টাকার বই। পরিসংখ্যান দেখে মনে হচ্ছে না, বাঙালির বইপ্রেমে ঘাটতি আছে? কিন্তু বাস্তবের মাটির চিত্র ভিন্ন। ট্রেনে, বাসে, বাড়িতে—সবার চোখ আটকে মুঠো ফোনে। মুষ্টিমেয় অংশে বেঁচে আছে বই পড়া। কয়েক বছর আগেও এমনটা ছিল না। সারা ভারতে বাঙালির পরিচিতি ছিল ‘বইপোকা’ নামে। দেখা যাক, নিয়মিত বই পড়ার উপকার কী কী?
ব্রেনের লাভ—বইয়ের আবিষ্কার মোটামুটি পাঁচ হাজার বছর আগে। পড়াশোনা শ্বাস নেওয়া বা খাওয়ার মতো শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া নয়। তাই আলাদাভাবে মস্তিষ্কের ‘রিডিং সেন্টার’ নেই। বই পড়া আমাদের মস্তিষ্কের কাছে একটা ফুলটাইম এক্সারসাইজ। নিয়মিত বই পড়লে ব্রেনে নিউরোনের জটিল নেটওয়ার্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে। ফলে ব্রেনের লেফ্ট টেম্পোরাল কর্টেক্স (ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত) ও সোমাটোসেনসরি কর্টেক্সের (শারীরিক সংবেদনশীলতার জন্য দায়ী) মধ্যে কানেকশন দৃঢ় হয়। বাড়ে স্মৃতিশক্তি, ফোকাস। পড়ার অভ্যাস স্মৃতিহ্রাস কমায়। অ্যালঝাইমার্সের আশঙ্কা কমে।
উপলব্ধির ক্ষমতা বাড়ে—‘থিয়োরি অব মাইন্ড’ বলে একটা কথা আছে। অর্থাৎ কে কী ভাবছেন, তাঁদের বিশ্বাস কী, মানসিক অবস্থা কেমন। বই পড়ার অভ্যেস এগুলি উপলব্ধির ক্ষমতা বাড়ায়।
কল্পনাশক্তি বাড়ে, স্ট্রেস কমে—৬ মিনিট বই পড়লে স্ট্রেস প্রায় ৭০ শতাংশ কমে। বই যখন পড়ি, তার চরিত্র, আবহ মনের মতো করে কল্পনা করে নিই। ফলে কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
সমৃদ্ধ হয় সাধারণ জ্ঞান—জ্ঞানভাণ্ডার বাড়ার কথা না হয় আর নাই বললাম। মনে রাখবেন, বইয়ের থেকে ভালো বন্ধু আর কিন্তু দু’টি নেই!
লিখেছেন সায়ন মজুমদার
বেশিরভাগ বাচ্চাকেই দেখি, হাতে ফোন। রিলস দেখছে। বলব, এর জন্য বাবা-মায়েরাই দায়ী। আমাদের ছোটোবেলায় বাবা-মাকে বই পড়তে দেখেছি। সেই মতো আমরাও বই পড়তে শিখেছি। এখন তো বাবা-মায়ের হাতেই সারাক্ষণ ফোন, রিলস-এ নজর। আমার ছাত্রছাত্রীদের দু-একজনের মধ্যে অবশ্য বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে পেরেছি। ওদের দেখে যদি আরো কয়েকজন বই পড়া শুরু করে!
লগ্নজিতা দাশগুপ্ত, শিক্ষিকা, দিনহাটা
রিলসের লাভ ক্ষতি
সোশ্যাল মিডিয়া। চটজলদি নিজেকে ফেমাস করার শর্টকাট! বড় ভিডিয়োর পাশাপাশি শর্টস, রিলসের জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে। ভিউ, লাইক, সাবস্ক্রাইবের দৌড়ে একবারও ভেবে দেখেছি, আমরা কী দিয়ে কী পাচ্ছি? রিলসে কতটা লাভ বা ক্ষতি হচ্ছে?
প্রথমেই আলোচনা করব, রিলস বানানো নিয়ে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক উদ্দেশ্য নিজেকে একটু গুরুত্বপূর্ণ, ‘টক অব দ্য টাউন’ হিসেবে তুলে ধরা। যে যাঁর নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী বানাচ্ছেন। কেউ রান্না নিয়ে, কেউ আবার অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন। অনেকে ইনফরমেটিভ রিল বানাচ্ছেন। কিন্তু, সেগুলি কতটা প্রাসঙ্গিক, তথ্যনিষ্ঠ ও প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, খুব অল্প সময়ে একঘেয়েমি কাটাতে রিলস দারুণ কাজ করে। চলজলদি নতুন কিছু শিখতেও অনেকে রিলসকে বেছে নিচ্ছে। এজন্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের রান্না, লাইফ হ্যাকস, ঘুরে-বেড়ানো, শারীরিক কসরত সংক্রান্ত ছোট্ট ভিডিওগুলি তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে কোনো বিষয়কে তুলে ধরতে গিয়ে সৃজনশীলতাতেও শান দেওয়া যায়।
কিন্তু, তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এতে লাভের থেকে ক্ষতিই হচ্ছে বেশি। আমাদের ব্রেন একটা কম্পিউটার। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে চোখ আটকে থাকার ফলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। ব্রেন হ্যাং হয়ে যাচ্ছে। ফলে ছোটোখাটো কাজ করতে গিয়েও ভুল হচ্ছে। শুধু বাড়িতেই নয়, পড়াশুনো-অফিস সর্বত্র তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা, রিলসের জন্য প্রচুর সময় নষ্ট হয়। এরমধ্যে একরকম অ্যালগরিদম কাজ করে। ফলে আপনি যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী, তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটির পর একটি ভিডিও আসতে থাকবে। ফলে কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে, তা বোঝাই যায় না।
দীর্ঘক্ষণ স্বল্প সময়ের ভিডিও দেখবার ফলে মনঃসংযোগ নষ্ট হয়। ফলে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করার ক্ষমতা থাকছে না। প্রতিমুহূর্তে স্ক্রিনে রঙিন দুনিয়ার মুখোমুখি হতে হতে অজ্ঞাতসারে হীনমন্যতা বা বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস দেখার ফলে ঘুমেও ব্যাঘাত ঘটছে। মানুষ ঘরকুনো হয়ে যাচ্ছে। বন্ধু-বান্ধব, সামাজিক জগতের সঙ্গে সংযোগও কমছে। ফলে সকলেই যেন একটা স্বপ্নের জগতে বসবাস করছেন! সমস্যাগুলি কোনোটিই ভিডিওগুলির মতো ছোটো বা শর্ট নয়, সবই জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই রিলসের নেশা কমাতে সরকারকেও উদ্যোগ নিতে হবে। দরকার সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। বিশেষত কিশোর-কিশোরীদের জীবনে।
লিখেছেন সুদীপ্ত সেন
কলেজ লাইফ পর্যন্ত প্রচুর বই পড়তাম। এখন কাজের চাপে আর আগের মতো বই পড়া হয়ে ওঠে না। বরং একটু সুযোগ পেলে রিলস-এ চোখ আটকে যায়। জানি খুব অ্যাডিক্টিট। কিন্তু সচেতন থাকি। বেছে বেছে ইনফরমেটিভ রিলসই দেখি। তাতে চটজলদি জ্ঞানও মেলে, কিছুটা মনোরঞ্জনও হয়ে যায়।
সুচরিতা চট্টোপাধ্যায়। বহুজাতিক সংস্থার কর্মী। শ্রীরামপুর।