Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

বিজেপির তিন খেলায় টার্গেট বাংলা!

গত লোকসভা নির্বাচনে ‘৪০০ পার’-এর স্লোগান ছিল আসলে এক ফাঁপা বেলুন। দেশের মানুষ সেই বেলুন ফাটিয়ে দিয়েছিল ভোটবাক্সেই। কিন্তু তাতেও থামেনি শাসকশক্তির নোংরা খেলা।

বিজেপির তিন খেলায় টার্গেট বাংলা!
  • ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গত লোকসভা নির্বাচনে ‘৪০০ পার’-এর স্লোগান ছিল আসলে এক ফাঁপা বেলুন। দেশের মানুষ সেই বেলুন ফাটিয়ে দিয়েছিল ভোটবাক্সেই। কিন্তু তাতেও থামেনি শাসকশক্তির নোংরা খেলা। আরও হিসাবি, আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে গেরুয়া শিবির। এই নতুন রাজনীতিতে তিন কৌশলে দেশের গণতন্ত্রকে অন্য পথে ঘোরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে মোদি সরকার।

Advertisement

প্রথমত, ‘এক দেশ, এক ভোট’। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বিপজ্জনক ফাঁদ। ভারতে বারবার ভোট হয় বলেই শাসকদলকে লাগাতার মানুষের সামনে জবাব দিতে হয়। সেই জবাবদিহি চিরতরে বন্ধ করতেই একসঙ্গে ভোটের প্রস্তাব। পাঁচ বছরে একবার ভোট মানে পাঁচ বছর কার্যত নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। আর এই দীর্ঘ ব্যবধানে যদি আবেগ উসকে দেওয়ার মতো কোনো বড় ঘটনা ঘটে, (যেমন— পুলওয়ামা, বালাকোট) তাহলে সেই আবেগেই একসঙ্গে সব ভোটের ফল ঘুরে যেতে পারে। তখন গণতন্ত্র নয়, আবেগই হবে নির্বাচনের চাবিকাঠি। জনগণের জন্য শাসকদল পাঁচ বছরে কী করল, তা নিয়ে দেশের নাগরিকদের প্রশ্ন উধাও হয়ে যাবে। শুধু হিন্দু আবেগ উসকে দাও আর ভোটে ফায়দা তোলো। যে উন্নয়ন, নিজের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলবে, সেই হয়ে যাবে দেশবিরোধী। ঠিক যেমন বাংলার আম জনতা। বাংলার জনগণ প্রশ্ন করতে জানে, তাই বিজেপির চোখে বাঙালি মানেই অনুপ্রবেশকারী!
দ্বিতীয়ত, ডিলিমিটেশন অর্থাৎ আসনের অঙ্ক বদলের খেলা। দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার চাষ করেও মেলেনি ৪০০ আসন। হিন্দুদের আবেগ উসকে দিয়েও কিছু রাজ্যের মানুষকে মোদিবাহিনীর পদানত করা যায়নি। অতএব আবার ষড়যন্ত্র। পালটাও নিয়ম। গোবলয়ের ক্ষমতা বাড়িয়ে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলো দক্ষিণ ভারত ও বাংলার মতো রাজ্যকে। কোনোরকম জনগণনা ছাড়াই ডিলিমিটেশন! আর এখানেই সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক চাল ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’-এর আড়ালে ডিলিমিটেশনের পথ খুলে দেওয়া। লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে এক ধাক্কায় ৮৫০ করার চেষ্টা সেই পরিকল্পনারই অংশ। গোবলয়ের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে বাকি রাজ্যগুলিকে ভোটযুদ্ধে মুছে দেওয়া। মোদি সরকারের মুখে নারীর ক্ষমতায়নের বার্তা, আর মুখোশের আড়ালে সংসদের অঙ্ক নতুন করে সাজানোর প্রস্তুতি। অর্থাৎ, এক ঢিলে দুই পাখি। একদিকে ইতিবাচক ভাবমূর্তি, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। প্রগতিশীল বাঙালি সেই ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চাল এসআইআর। ভোটার তালিকা থেকে হঠাৎ নাম উধাও। কোনো স্বচ্ছতা নেই, কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। অভিযোগ উঠছে, বেছে বেছে প্রান্তিক মানুষ, মহিলা, সংখ্যালঘুদের বাদ দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয়-রথ থামাতে এসআইআর-এর মতো একটা আপাতনিরীহ কর্মকাণ্ডকে হাতিয়ার করতে হয়েছে বিজেপিকে। গেরুয়া শিবিরের এই বাংলা দখল পরিকল্পনার দোসর নির্বাচন কমিশন। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে ছাঁকনি হাতিয়ার হয়ে উঠল। কাগজে-কলমে তারা স্বাধীন, নিরপেক্ষ। কোনো দলের সঙ্গে কোনো যোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে কী দেখছি? যখন ভুল ধরা পড়ে, তখন ‘মিসটেক’ বলে পাশ কাটানো। আর যখন চাপ দেখাতে হবে, তখন ‘আল্টিমেটাম’, ‘স্ট্রেট টক’ এই সব ভারী ভারী কথা! প্রশ্ন হল, এসব কি নির্বাচন কমিশনের ভাষা, নাকি মোদিবাহিনীর শেখানো বুলি?
বিজেপির ভিন রাজ্যের নেতারা এসে প্রচার করছেন, বাংলার অর্থনীতি নাকি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বাঙালি নাকি পিছিয়ে পড়ছে। অথচ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্যে কাজ করতে যায়। তারা কাজ করতে আসেন এই বাংলাতেও। ওই দুই রাজ্যে এখন বিজেপি সরকার। কেরল, পাঞ্জাব থেকে বিপুল মানুষ বিদেশে কাজ করতে যান। নিজের রাজ্যে চাকরি নেই বলে কি তাঁরা ভিন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন? তামিলনাড়ু বা কর্ণাটকের মানুষ বিশ্বজুড়ে কাজ করছেন, কই সেই রাজ্যগুলির উন্নয়ন নিয়ে তো প্রশ্ন ওঠে না! তাহলে বাংলার ক্ষেত্রেই এই প্রচার কেন?
সমস্যার সমাধানের নামে যদি আত্মসম্মানটাই বন্ধক রাখতে হয়, তাহলে সেটা উন্নয়ন নয়, সেটা আত্মসমর্পণ! ইতিহাস বলে, বাঙালিরা ইংরেজদের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। অবাঙালি-বাংলা বিদ্বেষীদের কাছেও আত্মসমর্পণ করবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ