


শোভন চন্দ, কলকাতা: উনুনের ধারে রাখা মুখোশ, পাশে ধাপ্পু খেলছে খুদেরা। সমানে বাজছে ঢাক, কাঁসর। একটু দূরে ঘুঙুর বাঁধা পায়ে চলছে ‘মুখা খেল’। মুখে বাঁধা বড় বড় মুখোশ। আজ শিবের গাজন-‘পিনহ্যা ডোরাকাটা বাঘছাল/ মাথায় বইন্ধ্যাছ জটার জাল’-গম্ভীরা। কেউ বলেন, ‘মুখা খেল’ বা ‘গোমিরা’। বাংলার প্রাচীন এই লোকনৃত্য ও গম্ভীরার মুখোশের আড়ালে থাকে লোকজীবনের অজস্র গল্প। সে গল্প শোনাবে ‘ভবানীপুর মুক্তদল’। ৭৭ বছরে পা দিল তাদের পুজো। এবার থিম ‘আড়ালে’। মণ্ডপ তৈরি করেছেন অভীক ও শুভম। ইট, বাঁশ, টিন, কাঠ দিয়ে তৈরি মণ্ডপ। সামনে টিনের চালাঘর। ঘরের একদিকে নাচের মুখোশ। বাঁশ দিয়ে তৈরি গাছের অবয়ব। গম্ভীরা নৃত্যে সাধারণত পৌরাণিক ইত্যাদি বহু বিষয় তুলে ধরা হয়। তাই মণ্ডপের পাশে বহুতলের দেওয়ালে আঁকা কালী, শিব-পার্বতীর ছবি। এবার মূর্তি গড়েছেন দীপঙ্কর পাল। দুর্গার মূর্তিতেও গম্ভীরা সংস্কৃতির ছাপ।
বাংলার উৎসব-সংস্কৃতির ছোঁয়া স্বাধীন সংঘেও। এবছর ৭৭ তম বর্ষ তাদের। থিম হয়েছে ‘বারোমাসে তেরো পার্বণ’। পয়লা বৈশাখের আগে চড়ক। তা যেমন থাকবে তেমনই থাকবে পটচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা প্রতিটি পার্বণ। কাঠের পেঁচা ও বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। প্রতিমা তৈরি করেছেন মিন্টু পাল। মণ্ডপসজ্জা পার্থ রায়চৌধুরীর। দেখতে দেখতে ৮২ বছরে পড়ল কালীঘাট মিলন সংঘের পুজো। এবার তাদের থিম, ‘উত্তরণ’। নামকরণের নেপথ্যে ক্লাবের অন্যতম কর্ণধার কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সামাজিক স্তরে যে বহুস্তরীয় উত্তরণ ঘটে তার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপজুড়ে। প্রতিমা গড়ছেন ক্লাবেরই সদস্য রাহুল পাল। একটু দূরে ‘স্বস্তিক’ থিমে সেজে উঠছে ভবানীপুর ৭৬ পল্লির মণ্ডপ। এ পুজোর এবার ৫৯ বছর। প্রতিমা নির্মাণ করছেন বাবু ও বাপি কর্মকার।
থিমের ভিড়েও সাবেকিয়ানার স্নিগ্ধ ছোঁয়া ভবানীপুর সর্বজনীন ধর্ম প্রসারিণী সমিতির দুর্গাপুজোয়। এবার ১০৪ বছর। ১৯২২
সালে কালীঘাটের আদিগঙ্গার তীরে মুখার্জি ঘাট এলাকায় শুরু হয় পুজো। শুরু থেকেই কালীঘাটের আদিগঙ্গায় স্নান সেরে মাকে অঞ্জলি দেওয়ার রীতি তাদের। সাবেকিয়ানাই এই পুজোর প্রাণ। জগন্নাথ মন্দিরের আদলে এবার তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। একটু অন্য পথে হাঁটছে ভবানীপুর বকুল বাগান সর্বজনীন। ৯৮ তম বর্ষে তাদের থিম ‘বিম্ব’। শুধুমাত্র বাহ্যিক চেহারা নয় এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চেতনের-মননের প্রতিফলনের রূপকে। চেতনরূপকে ঘষামাজা করে মানুষ সাধনার পথে এগিয়ে যায়। সেই ভাবনাই তুলে ধরেছেন শিল্পী অদিতি। প্রতিমা নির্মাণ করছেন হ্যালি গোস্বামী। ভবানীপুর থেকে বালিগঞ্জের দিকে গেলে, কলকাতার অন্যতম পুরনো পুজো আদি বালিগঞ্জ সর্বজনীনের দুর্গাপুজোর। ১৯২৭ সালে মাত্র ২৫ পয়সায় ঠাকুর বায়না করে পথ চলা শুরু। প্রাক শতবর্ষে এবারের ট্যাগলাইন-‘৯ পিঠে ৯, না দেখলেই নয়’। ফোম শিটের কারুকার্যে সেজে উঠছে মণ্ডপ। প্রতিমায় সাবেকিয়ানার ছোঁয়া।