Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘ভজন ক্লাবিং’: ভারতের নতুন নাইটলাইফ

শনিবারের সন্ধ্যা। বেঙ্গালুরুর কোরামঙ্গলার একটি নামী ক্যাফেতে বেশ ভিড়। সেই ভিড়েরই কিছুটা অংশ তখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে সামনের ফুটপাতে।

‘ভজন ক্লাবিং’: ভারতের নতুন নাইটলাইফ
  • ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: শনিবারের সন্ধ্যা। বেঙ্গালুরুর কোরামঙ্গলার একটি নামী ক্যাফেতে বেশ ভিড়। সেই ভিড়েরই কিছুটা অংশ তখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে সামনের ফুটপাতে। নাইট ক্লাবের বাইরে যে ভিড় দেখে অভ্যস্ত আমাদের চোখ। কিছুক্ষণ আড্ডার শেষে সেই ভিড়টা ঢুকে পড়ল ক্যাফের ভিতরে। সেখানে একটা রঙিন বোর্ডে বড়ো বড়ো করে লেখা, ‘ট্রেড ইয়োর হ্যাংওভার ফর হরিনাম।’ চারদিকে লাল-নীল নিয়ন আলো, লেজার শো আর ড্রামসের কান ফাটানো আওয়াজ। সাধারণত এই ধরনের ক্যাফে বা ক্লাবের পার্টিতে কান পাতলেই শোনা যায় বলিউডি প্লে লিস্টের ডান্স নাম্বার বা হার্ড মেটালের কানফাটানো গর্জন। সেই সঙ্গে গ্লাসে গ্লাসে চলকে ওঠে পানীয়। হুক্কার গা‌ঢ় ধোঁয়া মাদকতার মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয় আরও কয়েকগুণ। কিন্তু কোরামঙ্গলার ওই ক্যাফের ভিতরের ছবিটা যেন একেবারে আলাদা। একদল অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে দুলে দুলে গাইছেন ‘অচ্যুতম কেশবম কৃষ্ণ দামোদরম...।’ হলের একপাশে অনেকে নাচ করছেন। কিন্তু তাঁদের কারও হাতে কোনও পানীয়ের গ্লাস নেই। নেই হুক্কার ধোঁয়াও। স্টেজে ড্রামস বিট আর গিটারের স্ট্রিংয়ে ঝংকার উঠছে। কিন্তু কোনো পার্টি অ্যান্থেমের ছন্দে নয়, ভক্তিগীতির সুরে। আর সেই সুরেই পা মেলাচ্ছে জেন জি। এই প্রজন্মের ভাষায় এটাই ‘ভজন ক্লাবিং’। যেখানে আধ্যাত্মিকতা আর আধুনিক সংগীত মিলেমিশে একাকার।

Advertisement

বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা বা হায়দরাবাদ—ভারতের তথাকথিত ‘পার্টি ক্যাপিটাল’গুলিতে এখন এই ছবিটাই ‘নিউ নর্মাল’। এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই পুনে, সুরাত, চণ্ডীগড়, বৃন্দাবন, জয়পুর বা ইন্দোরের মতো শহরগুলিও। এতদিন যাঁরা নাইট ক্লাবের স্ট্রোব লাইটের ছন্দে কোনো আইটেম নম্বরে পা মেলাত, নিজেদের রঙিন সেলফি তুলত, তাঁরাই এখন হঠাৎ করে ভিড় জমাচ্ছে এমন সব ভজন পার্টিতে। কেউ একা একটু নিভৃত কোণে বসে হাততালি দিতে দিতে, কেউ আবার বন্ধুদের গলা জড়িয়ে পা মেলাচ্ছেন ভক্তিগীতির তালে তালে। এই দৃশ্য দেখলে হয়তো পুরানো প্রজন্মের কেউ কেউ ভ্রু কুঁচকোবেন। বলবেন, ‘ভজন কী আর এভাবে হয়!’ কিন্তু জেন জি’র কাছে ভজন মানে ঘরে একা বসে ভক্তিগীতি শোনা নয়। তাঁদের কাছে এ যেন এক উৎসব। সমস্ত বন্ধু মিলে একসঙ্গে বাঁচার আনন্দ। আসলে ভজন ক্লাবিংয়ের সময় যখন শত শত কণ্ঠ মিলে ‘ওম নমঃ শিবায়’ জপ করে, তখন সেখানে কোনো পারফরম্যান্সের চাপ তাড়া করতে থাকে না। হয়তো একই অফিসের কয়েকজন কর্মী বা একই ক্লাসের পড়ুয়ারা—যাঁরা একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বীর নজরে দেখেন, তাঁরাও এই ভক্তির ছন্দে নিজেদের সেই ইঁদুর দৌড় মার্কা প্রতিযোগিতা দূরে সরিয়ে রেখে আবেগের সুতোয় বাঁধা পড়েন। উপলব্ধি হয়, আসলে আমি কিছুই নই, আমরাই সব।

ইউরোপ বা আমেরিকায় ক্রমেই একাকিত্বের মহামারীতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। যার পরের অবশ্য গন্তব্য কোনো না কোনো মনোবিদের কাছে। তাঁরা কোনো রোগীকে দিচ্ছেন পোষ্য রাখার টোটকা, কাউকে বলছেন নিয়মিত পার্কে গিয়ে অপরিচিত মানুষদের সঙ্গেও আলাপচারিতা সারতে। এমনই এক একাকিত্বের পৃথিবীতে ভারতের এই নতুন প্রজন্ম ভজন আর কীর্তনকে বানাচ্ছেন তাঁদের সামাজিক মেলবন্ধনের পথ। দীর্ঘকাল ধরে আমরা আমাদের মনে সযত্নে কিছু ধারণা লালন করে আসি। তার মধ্যে অন্যতম— ভজন-কীর্তন মানেই বয়স্কদের জমায়েত। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। সম্প্রতি ‘নুম্রো বাণী’ এবং ‘হাউ ইন্ডিয়া থিংকস ২০২৫’-এর একটি সমীক্ষায় যে তথ্য উঠে এসেছে, তা চমকে দেওয়ার মতো। দেখা যাচ্ছে, পঞ্চাশোর্ধ্বদের ৬৮ শতাংশ এই ভজন  ক্লাবিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট। লেট মিলেনিয়ালদের মধ্যে এই হার ৭২ শতাংশ। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর হল জেন জি’র পরিসংখ্যান। এই নব প্রজন্মের ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী এখন প্রথাগত পার্টির চেয়ে ভজন ক্লাবিংকেই বেশি পছন্দ করছেন। ২০২৪ সাল থেকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই ‘মডার্ন কীর্তন’ বা ‘ভজন ক্লাবিং’ এখন সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে পরিণত হয়েছে। পরিবর্তনের এই হাওয়া যে কতটা তীব্র, তার প্রমাণ মিলেছে গুগল সার্চিংয়ের পরিসংখ্যানে। গত এক বছরে এই ট্রেন্ড প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন এই পরিবর্তন? দীর্ঘদিন ধরে গিগ ইকোনমি আর যান্ত্রিক জীবনের যে ‘অ্যালগরিদমিক শোষণ’ নিয়ে আমরা কথা বলছি, তার সবচেয়ে বড়ো শিকার সম্ভবত এই নতুন প্রজন্ম। সকাল ন’টা থেকে রাত ন’টা (কখনও কখনও তারও বেশি) পর্যন্ত ল্যাপটপ-বন্দি জীবন শেষে কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি এখন কী চান? সম্ভবত উত্তর একটাই আসবে—একটু শান্তি। আগে সেই শান্তির খোঁজে ভিড় জমত কোনো লাউঞ্জ বার বা নাইট ক্লাবে।

মনে করা হতো, মদের নেশা আর সিগারেটের ধোঁয়ায় হয়তো একদিনের গ্লানি মুছে যাবে। কিন্তু সুকুমার রায়ের সেই ‘খুড়োর কল’ যেমন চাকা ঘোরায় কিন্তু কোনো গন্তব্যে পৌঁছায় না, এই রাতের পার্টিগুলিও ঠিক তেমনই। পরের দিন সকালে একরাশ হ্যাংওভার আর একাকিত্ব ছাড়া আর কিছুই জুটত না। কিন্তু এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি হিসাবি। তাঁরা দেখছেন, যান্ত্রিক জীবনে সুখের খোঁজ করতে গিয়ে একদিকে শরীর ক্ষয় হচ্ছে, অন্যদিকে মনে বাসা বাঁধছে অবসাদ। তাই তাঁরা ফিরতে চাইছেন শিকড়ে। তবে সেই শিকড় আঁকড়ে ধরার স্টাইলটা একেবারেই তাঁদের নিজস্ব। তরুণ প্রজন্ম একে বলছে ‘ক্লিন রেভ’। অর্থাৎ যেখানে কোনো হ্যাংওভার নেই। আছে শুধু মানসিক শান্তি। তাঁরা আনন্দ চাইছেন। কিন্তু কৃত্রিম কোনো মাদকে শরীরকে বিষিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে নয়। বরং ভজনের সুরে, ভক্তির ছন্দে।

ভজন ক্লাবিংয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল উপস্থাপনা। প্রথাগত হারমোনিয়াম আর তবলার বদলে এখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কাহন, ড্রাম কিট, ইলেকট্রিক গিটার আর উকুলেলে। চেনা সুরগুলির সঙ্গে যোগ করা হয়েছে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের এনার্জি। কেন এই বদল? তার একটা বড়ো কারণ এই প্রজন্মের বেড়ে ওঠা। তাঁরা বড়ো হয়েছেন কনসার্ট, লাইভ অনুষ্ঠান আর ক্লাব কালচারের মধ্যে দিয়ে। ফলে ভক্তিগীতির সঙ্গে একটা বড়ো ব্যবধান ছিল এই নব প্রজন্মের। ভজন ক্লাবিং সেই ব্যবধানে একটা সুরেলা সেতু তৈরি করেছে। আর সেই সুরই এই নব প্রজন্মকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আধ্যাত্মিকতার দুনিয়ায়। এই প্রসঙ্গে মুম্বইয়ের ভজন ক্লাবিংয়ের দুনিয়ায় নামজাদা এক উদ্যোক্তার কথা মনে পড়ে গেল। তিনি একবার বলছিলেন, ‘আমরা যখন প্রথম ভজন সেশন শুরু করেছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো গুটিকয়েক বয়স্ক মানুষ আসবেন। কিন্তু দেখি কুড়ি-বাইশ বছরের তরুণ-তরুণীরা এসে হুল্লোড় করছেন। তাঁরা বলছেন, ডিস্কোতে নাচতে গেলে যে শারীরিক ক্লান্তি হয়, এখানে সেই একই এনার্জি খরচ করেও মনের ভেতর একটা প্রশান্তি পাওয়া যায়।’ এই পার্থক্যটাই ক্লাব কালচারের তুলনায় ভজন ক্লাবিংকে ক্রমে জনপ্রিয় করে তুলছে।

এই নতুন ট্রেন্ডের হাত ধরে ভারতের আধ্যাত্মিক ও ওয়েলনেস বাজার এক বিশাল উচ্চতায় পৌঁছেছে। বর্তমানে এই বাজারের মূল্য প্রায় ৫৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রতি বছর তা ১০-১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। মজার বিষয় হল, বর্তমানে অনেক জায়গায় বড়ো বড়ো ইডিএম (ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজিক) কনসার্টের থেকেও দ্রুতহারে বিক্রি হচ্ছে ভজন কনসার্টের টিকিট। এক-একটি শহরে প্রতিটি ইভেন্টে ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ টিকিট বিক্রি হওয়া এখন আর কোনো অবাক করা বিষয় নয়। তবে মুদ্রার উলটো পিঠও আছে। যে কোনো কিছু যখন ট্রেন্ডে পরিণত হয়, তখন তার বাণিজ্যিকীকরণও শুরু হয়। বহু আয়োজকের দাবি, তাঁরা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ব্যবসা করতে চান না। মানুষ যাতে নিজের মতো করে আধ্যাত্মিকতাকে খুঁজে পেতে পারেন, খুব কম খরচে সেই ব্যবস্থা করাই তাঁদের লক্ষ্য। কিন্তু তার পরেও দেখা যায়, অর্থনীতির লাভজনক সূত্র মেনে অনেক নামী রেস্তরাঁ বা ক্যাফে এখন শুধু ব্যবসায়িক অঙ্ক কষে এই ধরনের ‘ভজন কনসার্ট’-এর আয়োজন করছে।

একটা সময় ছিল যখন দেশে বা বিদেশের রাস্তায় ইসকনের ভক্তদের ‘হরে কৃষ্ণ’ নামগানে দু’হাত তুলে নাচতে দেখে অনেকে অবাক হতেন। ভাবতেন, এভাবেও ধর্মাচারণ হয়! আর সেই ভাবনা থেকেই ধর্ম ক্রমে এক দূরের গ্রহ হয়ে গিয়েছে। যা আছে, কিন্তু তা ছোঁয়ার অধিকার সবার নেই। পুঁথিমাফিক নিয়ম-নিষ্ঠা মানলে তবেই সেই ধর্মকে ছোঁয়া সম্ভব। আজকের জেন জি’রা ইলেকট্রিক গিটার আর ড্রাম বিটের উদ্দাম ছন্দে সেই ব্যবধানকেই এক ঝটকায় ঘুচিয়ে দিয়েছে। তাঁরা ধর্মকে আচারের গাম্ভীর্য থেকে মুক্তি দিয়ে মিশিয়ে দিয়েছে তাঁদের দৈনন্দিন যাপনের সঙ্গে। নিয়ে এসেছে হৃদস্পন্দনের কাছাকাছি । এই বিবর্তন আসলে ভক্তির এক নতুন ভাষা, যেখানে ড্রামসের প্রতিটি বিট এক-একটি নতুন প্রার্থনার মতো শোনায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ