Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মুখোশের আড়ালে...

ভোট এলেই মানুষের আবেগ উসকে দিতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ‘সুনাম’ কুড়িয়েছে। আর কয়েকমাস বাদে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন।

মুখোশের আড়ালে...
  • ৮ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভোট এলেই মানুষের আবেগ উসকে দিতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ইতিমধ্যেই যথেষ্ট ‘সুনাম’ কুড়িয়েছে। আর কয়েকমাস বাদে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচন। তার আগে বাঙালি আবেগ উসকে দিতে ‘বন্দেমাতরম’-এর ১৫০ বছর পালনের উৎসব শুরু হল কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ১৮৭৫ সালে হুগলির চুঁচুড়ায় গঙ্গার ধারের একটি বাড়িতে বসে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বন্দেমাতরম লিখেছিলেন, স্বাধীন ভারতে যা ‘জাতীয় গীত’ বা ‘জাতীয় স্তোত্র’ হিসেবে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুরারোপিত তাঁর এই অমর সৃষ্টি নিয়ে বঙ্কিম নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার অন্য সব রচনা গঙ্গায় ভেসে যাক, কিন্তু এই একটি মাত্র স্তোত্র বন্দেমাতরম চিরকাল বেঁচে থাকবে, মানুষের হৃদয়ে স্থান পাবে।’ যে রচনায় দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটেছে, যে মন্ত্র নিদ্রিত ভারতকে জাগিয়ে তুলেছিল আত্মবিশ্বাস ও ভক্তিতে—সেই শাশ্বত গীত তৈরির সার্ধশতবর্ষে মোদি সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যদিও অনেকের মতে, ভোটের অঙ্ক মেনেই এই বর্ষব্যাপী উদযাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই অঙ্কেই হয়তো দেখা যাবে, আর এক কৃতী বঙ্গসন্তান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন (২৩ জানুয়ারি) এবার ‘জাতীয় ছুটি’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে। যা আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুকালের দাবি। 

Advertisement

ভোটের অঙ্ক বা কৌশল যাই হোক, বিজেপি যে মনেপ্রাণে বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী, বন্দেমাতরম-স্মরণকালে রবীন্দ্রনাথকে ফের আক্রমণ করে তা আরও একবার বুঝিয়ে দিল মোদি-শাহের দলের এক সাংসদ। আরএসএস তথা বিজেপিকে লোকে জানে হিন্দুত্ববাদী একটি দল হিসেবে। বিভাজন, সংখ্যালঘু-বিদ্বেষ যাদের কর্মসূচিতে থাকে। কিন্তু মোদি-শাহের বিজেপি প্রায় প্রতিদিনই প্রমাণ করে চলেছে, ইতিহাস বিকৃতি, অসত্য প্রচার আর সীমাহীন অশিক্ষাও তাদের ভাণ্ডারে নতুন ‘অস্ত্র’। এই অস্ত্রে শান দিতে গিয়ে তারা কেউ অজ্ঞতাবশত আক্রমণের নিশানা করেছে ‘জাতীয় সংগীত’-এর জনক রবীন্দ্রনাথকেও! কিছুদিন আগেই অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বিশ্বকবির ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়ার ‘অপরাধে’ ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’-এর মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে এই গান তৈরি হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী সব বাঙালি হৃদয়ের এই গানকে ভোট-কুড়ানোর হাতিয়ার করেছিলেন নরেন্দ্র মোদিও। ২০১৪-তে কলকাতায় ভোটের প্রচারে এসে ‘আমার সোনার বাংলা’ উচ্চারণ করে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী মোদি। এ জন্য তিনি ‘অপরাধ’ না করলেও সম্প্রতি অসমের বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় কংগ্রেসের কর্মিসভায় এক প্রবীণ নেতা ‘আমার সোনার বাংলা’-র প্রথম দু’টি চরণ গেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর রোষানলে পড়েছেন। হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতে, এই গান প্রতিবেশী বাংলাদেশের ‘জাতীয় সংগীত’। অতএব সেই গান গেয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করা হয়েছে। আর খোদ দেশের জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন’-কে টেনে এনে রবীন্দ্রনাথকে অসত্য ও কুৎসিত আক্রমণ করেছেন কর্ণাটকের বিজেপি সাংসদ বিশ্বেশ্বর হেগড়ে। এই ‘অর্বাচীন’ সাংসদের দাবি, ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জকে তুষ্ট করতে এই গান লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অথচ সত্য হল, ১৯১১ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এই গান প্রথম গীত হয়। পরবর্তীকালে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘...শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও সঞ্চার হয়েছিল। তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থায় যুগ যুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথি, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক সেই যুগ যুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ কোনো জর্জই হতে পারেন না, সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন।’ বস্তুত গানটি নিয়ে সেইসময়েই একটি মহল যে বিতর্ক তৈরি করেছিল, বিজেপি সাংসদের দাবি সেই ‘ট্র্যাডিশন’কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিল। আসলে যারা মূর্খের স্বর্গে বাস করে তারা বিশ্ববরেণ্য বিশ্বকবিকেও অসম্মান করতে ছাড়ে না! সেই কারণেই হয়তো একদিকে বন্দেমাতরম বন্দনা, অন্যদিকে ‘জনগণমন’র অপমান— এটাই মোদির ভারতের সত্যি। 
আসলে অসমের মুখ্যমন্ত্রী বা কর্ণাটকের বিজেপি সাংসদ যা বলছেন, তাতে বিজেপির লক্ষ্যটা পরিষ্কার। সেই লক্ষ্য হল, বিভাজন তৈরি করা। এই রাজনীতির হাত ধরেই কখনও মুসলমান, কখনও বাংলা মানেই বাংলাদেশি, কখনও পোশাক, কখনও খাদ্যাভ্যাস, কখনওবা আমিষ দোকান বন্ধের ফতোয়া জারি হচ্ছে! রবি ঠাকুরের গানকেও এই বিভাজনেরই ‘অস্ত্র’ করা হচ্ছে! ইতিহাস বলছে, আরএসএস বা বিজেপি বরাবর বাঙালি বিদ্বেষী। তা সেই বরাকের বাঙালি বা দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কের বাঙালি বা বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা থেকে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকও হতে পারে। এই বিদ্বেষ-বিভাজনের অস্ত্রেই বাংলায় কথা বললেই পশ্চিমবঙ্গের কোনও মানুষকে ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারীর’ তকমা দিয়ে ওপারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের লেখা ও-পারের জাতীয় সংগীত গাইলে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে! অথচ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার অনেক আগেই এই গান লেখা হয়েছিল ভারতেরই মাটিতে। এখন বন্দেমাতরমের আবেগ দিয়ে এই সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অভিসন্ধিকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। প্রতিবাদই একমাত্র এই মুখোশ খুলে দিতে পারে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ