শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: তদন্ত শুরু হয়েছিল আড়াই লক্ষ টাকার ব্যাঙ্ক ড্রাফট প্রতারণা নিয়ে। অনুসন্ধান পর্ব এগতেই জানা গেল, টাকার পরিমাণ আসলে প্রায় ৫০ কোটি! বিএড কলেজগুলিতে ছাত্রছাত্রী জোগানোর নামে প্রতারণায় অভিযুক্ত ত্রিপুরার এক বাসিন্দা। বিষয়টি দেখে রীতিমতো অবাক ডিরেক্টরেট অব ইকনমিক অফেন্সেসের অফিসাররা (ডিইও)। এই ঘটনায় জড়িত
সন্দেহে উৎপলকুমার চৌধুরী নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে এভাবে কত টাকা হাতিয়েছে এবং এই চক্রে আরও কারা রয়েছে, জানার চেষ্টা চলছে।
মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিস সূত্রের খবর, সেখানকার একটি বেসরকারি বিএড কলেজে ছাত্রছাত্রী ভীষণ কম হতো। তাই বিভিন্ন এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা। তার মধ্যে ছিল ত্রিপুরার এক এজেন্টও। পড়ুয়া জোগানোর বিনিময়ে টাকা দেওয়ার চুক্তি হয় তাদের মধ্যে। এজন্য উৎপলকে আড়াই লক্ষ টাকার একটি ড্রাফট দেওয়া হয়। তারপরও ওই এজেন্ট কাউকে পাঠায়নি বলে অভিযোগ। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানতে পারেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট জাল করে ওই এজেন্ট বহুজনকে সেসব মোটা টাকার বিনিময়ে বেচেছে। এরপরই কলেজের তরফে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হয়। এই ব্যাপারে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, প্রতারণা, ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন ধারায় কেস রুজু করে বেলেডাঙা থানা।
উৎপলকুমার চৌধুরীকে যে ড্রাফট ইস্যু করা হয়েছিল, তদন্তে নেমে জেলা পুলিস তার কপি সংগ্রহ করে। ওই নম্বরটি বিভিন্ন ব্যাঙ্কে পাঠানো হয়। সেখান থেকে চিহ্নিত করা হয় বেশ কয়েকটি অ্যাকাউন্ট। সেগুলি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উৎপলের নামে একটি অ্যাকাউন্টেরও খোঁজ মেলে। টাকা সেখানেই ঢুকেছে। এমনকী, তিন-চার বছরে ওই অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেন হয়েছে। সেসব এসেছে বিভিন্ন জায়গা থেকে। স্বভাবতই ওই টাকার উৎস নিয়েও খোঁজখবর শুরু হয়।
তদন্তে প্রকাশ, একটি শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিএড কলেজে ভর্তির পরেও প্রচুর সিট খালি পড়ে থাকছে। সেগুলি ফিলআপ করানোর জন্য কলেজগুলি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে। কোন কলেজে কত সিট খালি রয়েছে, তাই নিয়ে তথ্য জোগাড় করত অভিযুক্ত ব্যক্তি। তাদের ছাত্রছাত্রী জোগান দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কলেজের সঙ্গে চুক্তি করত সে। কিন্তু শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে ছাত্রভর্তি সম্ভব কীভাবে? তদন্তে জানা গিয়েছে, ছাত্রছাত্রী জোগাড়ের পর তাদের সমস্ত নথি নিয়ে কলেজে পাঠানো হতো। ব্যাকডেটে ফর্ম ফিলআপ করিয়ে নিত কলেজ কর্তৃপক্ষ। ভিন রাজ্যের ওই পড়ুয়াদের ক্লাসই করতে হতো না। এমনকী পরীক্ষায়ও বসতে হয়নি তাদের। একটি শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার মাস খানেক আগেও এসেছে কিছু ছাত্রছাত্রী। তবু তাঁদের সেই বর্ষের বিএড ডিগ্রি লাভ আটকায়নি।
জেলা পুলিসের অফিসাররা নিশ্চিত যে, পরীক্ষা না দিয়ে স্রেফ টাকার বিনিময়েই সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে অনেক পড়ুয়াকে। এমনকী খাতায়কলমে কলেজ দেখিয়ে সেখান থেকে সার্টিফিকেট ইস্যু করা চলেছে। এভাবেই পরীক্ষা না দিয়ে, ক্লাস না করে ছাত্রছাত্রীদের ডিগ্রি পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে বিপুল টাকা রোজগার করেছে অভিযুক্ত ব্যক্তিটি। শুধু কলেজ নয়, ছাত্রছাত্রীদের ডিগ্রি পাইয়ে দেবে বলেও টাকা নিয়েছে সে। লোকটি মোট কতজনের কাছ থেকে টাকা তুলেছে? তার মাধ্যমে কোন কোন কলেজ এভাবে ডিগ্রি বেচেছে? জানার চেষ্টায় আছেন তদন্তকারীরা।