নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুকের দোকানই গুলির জোগান দিচ্ছে অপরাধীদের। বিগত তিন বছরে বিভিন্ন বৈধ দোকান থেকে চড়া দামে পাঁচ হাজারের বেশি গুলি তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ। ভুয়ো নথি জমা দিয়ে এগুলি কেনা হয়েছে। বন্দুকের বৈধ কারবার চালানো বিপণির কর্মী জয়ন্তর মাধ্যমে তা গিয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। তদন্তে নেমে এমন তথ্য হাতে এসেছে বেঙ্গল এসটিএফের। গুলি কোন কোন দুষ্কৃতী দলের কাছে গিয়েছে, তা খুঁজে বের করাই চ্যালেঞ্জ তদন্তকারীদের। একইসঙ্গে আর্মসের জাল লাইসেন্স দিয়ে কারা আগ্নেয়াস্ত্র কিনেছে এই দোকান থেকে, তাদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এদিকে এই ঘটনায় হাড়োয়া থেকে ফারুক মল্লিক নামে আরও একজনকে রবিবার গ্রেপ্তার করেছে এসটিএফ। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে একটি ডাবল ব্যারেল গান ও চারটি কার্তুজ। এই নিয়ে সব মিলিয়ে গ্রেপ্তারির সংখ্যা হল পাঁচ। শনিবার জীবনতলা থেকে বন্দুকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানের কর্মী সহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে বেঙ্গল এসটিএফ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরির ছাপ মারা কার্তুজ। ধৃত দোকানের কর্মী জয়ন্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জেনেছেন, সে বহুদিন ধরে গুলি পাচারের কাজ করছে। অন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকানের কর্মীরা তার সিন্ডিকেটে রয়েছে। তারাও গুলি সরবরাহ করেছে। জীবনতলা থেকে ধরা পড়া আশিক ইকবাল গাজি, হাজি রসিদ মোল্লা ও আব্দুল সেলিম গাজিরা এক একটি গুলি কিনত পাঁচ থেকে ছশো টাকায়। সেগুলি দুষ্কৃতীদের কাছে বিক্রি হতো আটশো থেকে হাজারে। অথচ বৈধ লাইসেন্সধারীদের একটি গুলি কিনতে লাগে ১৫০ টাকা। তদন্তে উঠে এসেছে, শেষ তিন বছরেই পাঁচ হাজারের কাছাকাছি গুলি বিক্রি হয়েছে। তদন্তে সংখ্যাটা আরও বাড়বে বলে নিশ্চিত তদন্তকারীরা। তদন্তকারীরা জেনেছেন, গুলির পাশাপাশি নাইন ও সেভেন এমএম পিস্তল, দোনলা বন্দুকও সরররাহ করা হয়েছে। তা চলে গিয়েছে দুই চব্বিশ পরগনা ও কলকাতার বিভিন্ন অপরাধীদের হাতে। কত আগ্নেয়াস্ত্র গিয়েছে, তার হিসেব কষছেন তদন্তকারীরা।
Advertisement
তদন্তে উঠে এসেছে, বন্দুকগুলি কেনার জন্য জয়ন্ত বিভিন্ন ব্যক্তির নামে উত্তর পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স করিয়েছিল। এরজন্য সে বিভিন্ন ব্যক্তির নথি জোগাড় করে। সংশ্লিষ্ট রাজ্য থেকে জাল আধার কার্ড, পুলিস ও জেলাশাসকের নকল এনওসি তৈরি করে ভুয়ো আর্মস লাইসেন্স তৈরি হয়। লাইসেন্সগুলি নিজের কাছেই রাখত জয়ন্ত। নিজে যেখানে কাজ করত, সেখান থেকে কার্তুজ কেনা হতো। সূত্রের খবর, বৈধ লাইসেন্সধারীর ৫০টি কোটা রয়েছে গুলি কেনার। বিশেষ কারণ দেখিয়ে দুশোটি পর্যন্ত কিনতে পারেন। এক্ষেত্রে লাইসেন্স পিছু ২০০টি গুলি কিনেছে এই চক্রের সদস্যরা। এমনকী ভিন রাজ্য থেকে ইস্যু হওয়া আর্মস লাইসেন্স দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র কেনে অভিযুক্ত। সেগুলি চক্রের সদস্যদের বিক্রি করে মোটা টাকার বিনিময়ে। যেগুলি হাতবদলে পৌঁছয় অপরাধীদের হাতে। গুলি উদ্ধারের ঘটনায় যে দোকানের নাম জড়িয়েছে, তার রেজিস্টার ঘেঁটে তদন্তকারীরা দেখেছেন, নথি জমা দিয়ে যত গুলি তোলা হয়েছে, তার সিংহভাগই ভুয়ো। তারা কতদিন অন্তর লালবাজারে গুলি ও বন্দুক বিক্রির তথ্য পাঠাত, সে বিষয়ে বেঙ্গল এসটিএফ কলকাতা পুলিসের কাছে জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি কলকাতা পুলিসও তাদের এলাকায় থাকা লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুকের দোকানগুলির কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি কেনার সময় যে নথি জমা দেওয়া হয়েছিল, তা দেখতে চাইছে।
এদিকে জীবনতলায় অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে এদিন বিধানসভার অধ্যক্ষ তথা বারুইপুর পশ্চিমের বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, আগেই এই অস্ত্র উদ্ধার হওয়া উচিত ছিল। তিনি মনে করেন এটা পুলিসের ব্যর্থতা।



