নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ব্যাঙ্ক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার ‘সংস্কৃতি’ ক্রমশ বাড়ছে দেশে। ঋণখেলাপিদের তালিকায় অন্যান্যদের সঙ্গেই জায়গা করে নিয়েছে নামজাদা একাধিক বড় সংস্থা। ঋণ নিয়ে ব্যাঙ্কের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়া প্রতারকের সংখ্যাটাও কম নয়। তথ্য বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জমানায় দেশে ঋণ নেওয়ার নামে ব্যাঙ্কগুলিতে প্রতারণা হয়েছে ৪ লক্ষ ৮৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকার। অর্থাৎ প্রায় পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার শুধুমাত্র ঋণ সংক্রান্ত প্রতারণা হয়েছে ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত সময়ে। গত তিন বছরের মধ্যে ঋণ সংক্রান্ত প্রতারণার অঙ্ক লাফিয়ে বেড়েছে। যে পরিমাণ জালিয়াতি হয়েছে, সেই তুলনায় টাকা উদ্ধার হয়েছে সামান্যই।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ব্যাঙ্কগুলিতে আর্থিক জালিয়াতি হয়েছে ১৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার। তার পরের অর্থবর্ষে অঙ্কটা সামান্য কমে হয় ১০ হাজার ৭২ কোটি। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তা ফের লাফিয়ে বেড়ে পৌঁছয় ৩৩ হাজার ১৪৮ কোটি টাকায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, এক লক্ষ বা তার বেশি টাকার জালিয়াতি হয়েছে, এমন ঘটনাগুলিকেই এই হিসেবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার চেয়ে কম অঙ্কের জালিয়াতির ঘটনাগুলি অন্তর্ভুক্ত করলে মোট জালিয়াতির পরিমাণ অনেকটাই বাড়বে। জানা গিয়েছে, প্রতারকদের থেকে আদায়ের পরিমাণ গত তিন বছরে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর মোদি জমানা ধরলে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার প্রতারণা হলেও উদ্ধার করা গিয়েছে মাত্র ৩২ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা।
ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের সংগঠন অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগর বলেন, ‘ঋণের নামে বিপুল আর্থিক জালিয়াতির অন্যতম কারণ কঠোর আইন না থাকা এবং সরকারের সদিচ্ছার অভাব। প্রতারণা আটকানোর সঠিক কৌশল বা পরিকাঠামো না থাকার জন্যই সমস্যা বাড়ছে। জালিয়াতি এভাবে বাড়তে থাকলে ব্যাঙ্কগুলি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হলে তার দায় নিতে হবে গ্রাহককেই। কারণ, যত টাকাই আমানতে জমা থাকুক না কেন, গ্রাহক পিছু বিমা মারফত ক্ষতিপূরণ মিলবে সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা। তাছাড়া ব্যাঙ্কগুলি লোকসানের পথে হাঁটলে, ঋণের উপর সুদের বোঝা যেমন বাড়তে পারে, তেমনই আমানতের ওপর সুদের হার কমতে পারে।’
কেন্দ্রীয় সরকারের অবশ্য দাবি, প্রতারণা রুখতে এক গুচ্ছ পদক্ষেপ করেছে তারা। সেই তালিকায় আছে ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপ্সি কোড’, যা টাকা আদায়ের কার্যকরী আইন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ‘সেন্ট্রাল রিপজিটরি অব ইনফরমেশন অন লার্জ ক্রেডিটস’ তৈরি হয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে। এছাড়াও ব্যাঙ্কগুলির তরফে চালু হয়েছে আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমস, যেখানে ৮০টি দিক থেকে নজরদারি চালানো হয় ঋণ সংক্রান্ত তথ্যের উপর। চালু হয়েছে ইন্ডিয়ান সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার। তবে প্রতারণা যেভাবে বাড়ছে, তাতে কেন্দ্রীয় উদ্যোগগুলি কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।