


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গুজরাতের বিভিন্ন স্কুল-আদালতে বোমা বিস্ফোরণের হুমকি দিয়ে পাঠানো ইমেল কাণ্ডের তদন্তে নেমে বনগাঁর গোপালনগরের গোবিন্দপল্লি থেকে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে সে রাজ্যের পুলিশ। ধৃত যুবক বছর তিনেক আগে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে এসে সৌরভ বিশ্বাস নাম নিয়ে এখানে বসবাস করছিল। যুবকের আসল নাম মাইকেল বিশ্বাস। গত শনিবার রাতে আমেদাবাদ পুলিশের ডিটেকশন অব ক্রাইম ব্রাঞ্চ ও সাইবার সেলের যৌথ অভিযানে ধরা পড়ে সৌরভ। ধৃতকে ট্রানজিট রিমান্ডে ১৪ দিনের হেপাজতে গুজরাতে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীরা মনে করছেন, শুধু গুজরাতই নয়, বাংলা, বিহার, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, কর্ণাটক সহ দেশের কমপক্ষে আটটি রাজ্যের বিভিন্ন স্কুল-আদালত, ডাকঘরে ইমেল পাঠিয়ে বোমা বিস্ফোরণের হুমকি দিচ্ছিল যে চক্রটি, তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই সৌরভ। চক্রটি বাংলাদেশ থেকে সক্রিয় হয়েছে। এই চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। ভারতে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছিল আইএসআই। এই বিষয়ে গুজরাতের ডিটেকশন অব ক্রাইম ব্রাঞ্চ বিবৃতি আকারে জানিয়েছে—বিভিন্ন নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে প্রযুক্তিগত ফাঁকফোকর খুঁজে, তার মাধ্যমে নিজের কাজ হাসিল করতে চেয়েছিল সৌরভ নামে ওই যুবক। তদন্তকারীরা বলছেন, প্রফেশনাল হ্যাকার সৌরভ বিভিন্ন লোকজনের ইমেল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করত। অ্যাকাউন্ট পিছু ৩ ডলারে তা বিক্রি করত বাংলাদেশি চক্রকে। হুমকি মেল তৈরি হত বাংলাদেশে। সেই মেলগুলি ‘এনক্রিপটেড’ এবং নিজের পরিচয় গোপন রাখতে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করত মাইকেল ওরফে সৌরভ। ‘মাস্ক’ পড়ানো মেলগুলির উৎস সন্ধানে তাই যথেষ্ট বেগ পেতে হয় তদন্তকারীদের। সম্প্রতি এ রাজ্যের বিভিন্ন আদালত-ডাকঘরে বোমা বিস্ফোরণের হুমকিভরা যে মেলগুলি আতঙ্ক ও আলোড়ন ছড়িয়েছিল, তার পিছনেও বাংলাদেশি চক্রটি যুক্ত বলে গুজরাতের তদন্তকারীরা জেনেছেন।
গুজরাত পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, আইএসআইয়ের হয়ে চরবৃত্তি করতেই তিন বছর আগে বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে চোরাপথে এদেশে ঢোকে সৌরভ। দালালের মাধ্যমে ঠাঁই নেয় নিউ বারাকপুর এলাকায়। ওই দালালের মাধ্যমেই প্যান, আধার, ভোটার কার্ড তৈরি করায়। মাইকেল নামটাও তখনই পাল্টানো হয়। এরপর এই সব নথি দিয়ে বনগাঁর পাসপোর্ট সেবাকেন্দ্র থেকে ভারতীয় পাসপোর্টও বানিয়ে নেয়। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করা সৌরভ এরপর চলে আসে গোপালনগরে। প্রথমে সেখানে ভাড়া থাকলেও, পরে জমি কিনে বছর দেড়েক আগে বাড়ি বানায়। আইএসআই এবং বাংলাদেশি চক্রকে সাহায্য করার জন্যই একটি সাইবার ক্যাফেও খোলে সে। সেখান থেকে বসেই যাবতীয় কুকর্ম চালাত।
কীভাবে ধরা পড়ল সৌরভ? তদন্তকারীরা বলছেন, মেল আইডি ‘মাস্ক’ পরানো থাকায় জানা যাচ্ছিল না কোন আইপি অ্যাড্রেস থেকে সেগুলি আসছিল। তবে তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, পরিচয় গোপন রাখতে ভিপিএন ব্যবহার করছে এই বাংলাদেশি যুবক। ভিপিএন এবং মেল সার্ভিস প্রোভাইডার গুগল এবং প্রোটনের কাছে সাহায্য চান তদন্তকারীরা। দেখা যায় ওয়াই ফাই ব্যবহার করা হচ্ছে মেল পাঠাতে। ওয়াই ফাই সংক্রান্ত ডাটা জোগাড় করে পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করেন তদন্তকারীরা। জানা যায়, মেলগুলি পাঠানো হচ্ছে বনগাঁ থেকে। এরপরই গ্রেপ্তার করা হয় তাঁকে। তদন্তকারীরা জেনেছেন, বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের অনলাইন ফর্ম পূরণের জন্য যে সব ব্যক্তি তার কাছে আসত, তাদের মেল আইডি বানিয়ে দিত সৌরভ। পরে সেব মেল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে নাম বদলে দিত।
ধৃত সৌরভ বিশ্বাস ওরফে মাইকেল।