সমীর সাহা, নবদ্বীপ: থার্মোকলের বাড়বাড়ন্তে একসময় শোলাশিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে। উমার সাবেকি সাজসজ্জা তৈরির সঙ্গে যুক্ত শোলাশিল্পীরা ক্রমশ কাজ হারাতে থাকেন। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও শোলার গয়না তৈরির কাজে আগ্রহ হারিয়ে অন্যান্য পেশায় যোগ দেয়। বর্তমানে থার্মোকলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তাই উমাকে ফের সাবেকি সাজে ফেরাতে শোলা শিল্পের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণে এখন দক্ষ কারিগর মিলছে না। ফলে হাত কামড়াচ্ছেন নবদ্বীপের তেঘরিপাড়ার প্রবীণ শোলা শিল্পীরা। তবে চাহিদার কথা মাথায় রেখে কেউ কেউ আবার পুরনো পেশায় ফিরে আসছেন। সবমিলিয়ে দুর্গাপুজোর আগে রাতদিন পরিশ্রম করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করছেন নবদ্বীপের শোলা শিল্পীরা।
নবদ্বীপ পুরসভার ২৪নম্বর ওয়ার্ডের তেঘরিপাড়া সুধাংশু চ্যাটার্জী লেনে এখনও বেশকিছু পরিবার শোলার কাজ করে চলেছে। বর্তমানে প্রায় ২৫জন শিল্পী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বেশকিছু পরিবার বংশপরম্পরায় শোলার সাজ তৈরি করে চলেছেন। এক শিল্পী জানান, বাংলাদেশ থেকে জয়নগর হয়ে শোলা আনতে হয়। সেই শোলা কেটেই দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশের বিভিন্ন সাজ তৈরি করা হয়। দেবীর আঁচল, মুকুট, ঘাড়-বেণি, কানপাশা, হাত-জোড়, হাতের বালা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ থেকে শুরু করে অসুরের যাবতীয় সাজ তৈরি করা হয়। এছাড়া প্রতিমার শোলার চালচিত্রের কলকা কিংবা বিভিন্ন সাইজের চাঁদমালাও তৈরি হয়। এখানকার শিল্পীদের তৈরি শোলার সাজ বীরভূম, সিউড়ি, বোলপুর, কালনা, কাটোয়া, সমুদ্রগড়, পূর্বস্থলী, গুপ্তিপাড়া সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত এবং ত্রিপুরাতেও পাড়ি দিয়েছে।
সুধাংশু চ্যাটার্জী লেনের বাসিন্দা সাজশিল্পী প্রদীপ দত্ত বলেন, এই এলাকায় আমরাই বংশপরম্পরায় শোলার কাজ করে চলেছি। শোলার সাজের চাহিদা রয়েছে ঠিকই। তবে শোলা সরবরাহের যথেষ্ট অভাবও রয়েছে। পাশাপাশি, নতুন প্রজন্মের কেউই এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত না হওয়ায় শিল্পীরও অভাব রয়েছে। চার হাত উচ্চতার প্রতিমার সম্পূর্ণ একটি শোলার সাজ করতে তিন-চারদিন সময় লাগে। সেই সেটের দাম ১৯-২০ হাজার টাকা। প্রতিমার উচ্চতা বুঝে সাজের দাম নির্ধারণ করা হয়। ডিজাইন এবং গুণগত মানের উপরও সাজের দাম নির্ভর করে।
অপর শিল্পী ঝন্টু দত্ত বলেন, সাজ তৈরি করা খুবই পরিশ্রমের কাজ। পুজো কমিটির কর্মকর্তারা ডিজাইন পাঠিয়ে দেন। সেইমতো শোলার উপর হাতে এঁকে সেগুলি ডিজাইন করতে হয়। এরপর চাকু, কাঁচি দিয়ে কেটে সেগুলি আঠা লাগিয়ে সেটিং করতে হয়। বৃদ্ধা শিল্পী কল্যাণী দত্ত বলেন, বংশপরম্পরায় আমরা এই শোলার সাজ তৈরি করে চলেছি। এই কাজের খুবই চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আমরা ঠিকমতো সাজ সরবরাহ করতে পারছি না। স্থানীয় ঘোষপাড়ার বাসিন্দা শিল্পী পার্বতী ঘোষ, নমিতা মজুমদার ও বুলুরানি ঘোষরা বলেন, এখানে আমরা দেবদেবীর বিভিন্ন সাজ, চালির কলকা, চাঁদমালা তৈরি করি। গৃহস্থালির কাজ সেরে এই কাজ করি। প্রতি মাসে মাত্র ১৫০০টাকা রোজগার হয়। নিজস্ব চিত্র