সুদীপ্ত সেন, কলকাতা: মহালয়ার সকাল। ঘড়িতে বেলা ১১টা। উত্তর কলকাতার নলিন সরকার স্ট্রিটের মণ্ডপে দেবীর চক্ষুদান করবেন সনাতন দিন্দা। চারপাশে সাজো সাজো রব। হঠাৎই সেখানে হাজির আরও এক শিল্পী ভবতোষ সুতার। তাঁকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন সনাতন। হাত ধরে ‘ভবাদা’কে প্রতিমার সামনে নিয়ে এলেন। আবদার, ‘আজ দু’ভাই একসঙ্গে মায়ের চোখ আঁকব।’ বিরল এক মুহূর্তের অপেক্ষায় শুরু সময় গোনা। তারমধ্যেই নস্টালজিয়ায় ডুব দিলেন ভবতোষ। বলছিলেন, ‘আর্ট কলেজে আমার সঙ্গে সনাতনের দেখা হয়নি। পাঁচ বছরের একটা গ্যাপ ছিল। কিন্তু, ওর থেকে অনেক কিছু শিখেছি। ওর মতো একজন শিল্পীই চোখের নিমেষে লাল-নীল-সবুজ-হলুদ দিয়ে চোখ এঁকে দিতে পারে।’ বিনয়ে মাথা নত সনাতনের। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এল চা। ধোঁয়া ওঠা পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে আরও একবার প্রতিমার কাছে চলে গেলেন দু’জনে। সৃষ্টি নিয়ে ফের একদফা মত বিনিময়। তাল কাটলেন ভবতোষ। বললেন, ‘এবার বেরব’। অধরাই থাকল বিরল মুহূর্ত। তিনি ফেরার পথ ধরতেই উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন বলে উঠলেন, ‘একবার দু’জনেই একসঙ্গে কাজ করুন না!’ ভবতোষ বললেন, ‘তাহলে আর কাজ হবে না। আড্ডাই হবে।’
ভবাদা ফিরতেই মায়ের চক্ষুদানের পালা। প্রতিমার সামনে অস্থায়ী প্ল্যাটফর্ম। তার উপরেই একটা টেবিল। পাটাতনের মই বেয়ে উপরে উঠে কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চক্ষুদান শুরু হল তৃতীয় নেত্র দিয়ে। প্রথমে গোলাপি। প্রত্যেকবার তুলির ছোঁয়ায় ‘রূপান্তর’ ঘটছে মায়ের। মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে উঠছেন দেবী। একে একে নীচের দুই চোখ। সেখানে সবুজের ছোঁয়া। দু’ধাপে শেষ চক্ষুদান। মায়ের জীবন্ত চোখে হাসি খেলা করছে! দেবী দুর্গা এখানে অষ্টাদশী। পরণে বেনারসি। আঠারো হাত। নৃত্যরতা। আপন ছন্দেই সাধারণের বৃত্ত ভেঙে অধরাকে ছোঁয়ার ব্রত নিয়েছেন শিল্পী।
২০১১ সালে নলিন সরকার স্ট্রিটে ঝুলন্ত দুর্গা বানিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন সনাতন। ১৪ বছর পর শিল্পী ফিরে এসেছেন পুরনো জায়গায়। একে কী ঘরে ফেরা বলবেন? প্রশ্ন শুনেই শিল্পীর জবাব, ‘ঘরেই ছিলাম, ঘরেই আছি। আসলে আমি তো নাবিক। বন্দর থেকে বন্দর ঘুরে বেড়াতে হয়।’ এবার এই পুজোর থিম ‘রূপান্তর’। শিল্পীর কাছে এর অর্থ কী? প্রশ্ন শুনেই সনাতনী ভাবনার গভীরে ডুব শিল্পীর। বললেন, ‘রূপান্তর মানে জীবন আর যাপন।’ এই দুইয়ের মধ্যে যোগসূত্র বা বিভেদ কোথায়? জবাব, ‘প্রতিটা মানুষ বাহ্যিকভাবে একই রকম। কিন্তু, প্রত্যেকের চিন্তাভাবনা আলাদা। আমরা ভারতীয় হয়ে নিজেদের সংস্কৃতি থেকে রূপকথার আশ্রয় নিচ্ছি। পুরাণের কথা ভাবছি। প্রতি মুহূর্তে সকলেই রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।’
নলিন সরকার স্ট্রিটের প্রতিমা থেকে মণ্ডপ সর্বত্রই সেই বদলের প্রতিচ্ছবি। রূপকথার বিভিন্ন গল্পের চরিত্ররা হাজির হয়েছেন অন্য রূপে। শুরুতে গল্পের গোরু গাছে উঠেছে। তারপরেই সাতভাই চম্পা, ব্যাঙ্গমা, ব্যাঙ্গমি, লালকমল, নীলকমল। মূল মণ্ডপ থেকে মুখ বাড়িয়ে রয়েছে বাইবেলে উল্লিখিত নোয়াজার। অন্দরে পুরাণের নানান চরিত্ররা। একদিকে দেবকূল ও অন্যদিকে রাক্ষসরা। তবে এসবে নজর নেই দেবীর। তিনি নৃত্যরতা। তাঁর নেপথ্যে মহাকাল। মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহৃত হয়েছে হাট থেকে কেনা সস্তার সামগ্রী। প্রতিমা ছাড়া আর কোথাও রংও ব্যবহার করেননি শিল্পী। জন্মশতবর্ষে প্রখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বেজে চলেছে তাঁর অমর সৃষ্টি, ‘সাত ভাই চম্পা জাগো রে...’।