স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: বজবজের পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাস। ইতিউতি উপনিবেশের চিহ্ন স্পষ্ট। স্টেশন থেকে শুরু করে স্মৃতিসৌধ, চার্চ, কারখানা— সব কিছুতেই লেপটে রয়েছে ইতিহাস। শুধু তাই নয়, ‘বজবজ’ নামের মধ্যেও উপনিবেশের আধিপত্য ও স্থানীয় ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে বলে আজও বিশ্বাস করেন স্থানীয়রা। রেল স্টেশনকেও ছুঁয়েছে ইতিহাস। ১৯১৪ সালে কানাডা যে ৩৭৬ জন ভারতীয়কে ফেরত পাঠিয়েছিল, তাঁরা জাপানি জাহাজ কোমাগাতা মারুতে করে ফিরে এলেও ব্রিটিশরা কলকাতা বন্দরে ভিড়তে দেয়নি। শেষমেশ সেটি নোঙর করতে বাধ্য হয়েছিল বজবজে। সেখানে রক্তগঙ্গা বয়ে ছিল। সেই স্মৃতিকে অমর রাখতেই স্টেশনের নাম রাখা হয়েছিল, কোমাগাতা মারু বজবজ। স্থানীয়রা বলেন, ‘১৭০০ সালে পর্তুগিজ উপনিবেশ থাকাকালীন সাহেবরা এলাকার জলাজমির উপর দিয়ে বুট পরে হাঁটলে ‘বজবজ’ শব্দ হত। সেই থেকেই এলাকার নাম বজবজ।’ যদিও এই ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে।
বজবজে গত ৩০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে খোদাই হয়েছে একটি নাম। অশোক দেব। ১৯৯৬ সালে কংগ্রেসের টিকিটে এখান থেকে প্রথম বিধায়ক হন তিনি। ২০০১ সালের ভোটের আগে তৃণমূলে শামিল হন অশোকবাবু। তারপর থেকে এখনও অশোক ‘সাম্রাজ্যে’ চিড় ধরেনি সামান্য। সৌজন্যে এই বর্ষীয়ান নেতার নিবিড় জনসংযোগ। তবে তৃণমূলের এই শক্ত ঘাঁটি ভাঙতে কর্মসংস্থানকে হাতিয়ার করেছে বিরোধীরা। ব্রিটিশ আমল থেকেই হুগলি নদীর ধারের এই জনবসতি কারখানাকেন্দ্রিক। এটি দক্ষিণ ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চলও বটে। বামফ্রন্ট সরকারের শেষলগ্ন থেকেই একের পর এক জুটমিল, জুতো কারখানা সহ বিভিন্ন ছোটো কল-কারখানা বন্ধ হতে শুরু করে। তৃণমূল শাসনে সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে। তাই কর্মহীন শ্রমিকদের একত্রিত করে ভোটযুদ্ধে অশোকের ডেরা ভাঙতে চায় বিজেপি-সিপিএম। প্রচারের ইস্যুতেও মূলত কর্মসংস্থান ও নাগরিক পরিষেবাকেই টার্গেট করেছে বিরোধীরা। একইসঙ্গে একনায়কতন্ত্র ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলছে তারা।
দীর্ঘদিন ধরেই বজবজের মানুষের একটা বড়ো সমস্যা হল পরিবহণ। খাস কলকাতা থেকে সহজে ও দ্রুত বজবজে পৌঁছানোর একটাই পথ— ট্রেন। কারণ, বজবজ ট্রাঙ্ক রোডের অবস্থা এক সময়ে ছিল ভয়াবহ। শিল্পতালুক হওয়ায় এই রুটে ভারী যানবাহনের বহুল যাতায়াত। রাস্তা তৈরি হলেও ২-৩ মাসের মধ্যে তা কঙ্কালসার হয়ে যায়। কিন্তু, গত পাঁচ বছরে আমূল পরিবর্তন হয়েছে বজবজ ট্রাঙ্ক রোডের। ভঙ্গুর এলাকাগুলিকে চিহ্নিত করে পেভার ব্লক দিয়ে মেরামতি করা হয়েছে। অন্বেষা রায় নামের এক বাসিন্দার কথায়, ‘চড়িয়াল সেতু ভেঙে নতুন করে তা তৈরি হয়েছে। আগে এই সেতু সিঙ্গল লেন হওয়ায় অনেক বেশি সময় লাগত। যানজটও হত। কিন্তু, এখন ডবল লেন হয়ে যাওয়ায় যাতায়াতের সমস্যা মিটেছে।’
পুজালির গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর মণ্ডল বলছিলেন, বিধানসভা নির্বাচনের আগে কৃষিকাজের জন্য একটি বড়ো কাজ শুরু হয়েছে। কৃষিজমিতে জল পৌঁছে দিতে নদীরপাড়ে স্লুইস গেট তৈরি হচ্ছে। নির্বাচন মিটলেই বাকি কাজ সম্পূর্ণ হবে। তার সুবিধা পাবেন এলাকার চাষিরা। বজবজের তৃণমূল প্রার্থী অশোক দেব বলেন, ‘এত বছর এলাকায় আছি। কাজ না হলে মানুষ কীসের ভিত্তিতে আমার উপর ভরসা রাখেন! এলাকার প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে। সবকটি পাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের উন্নয়নের সাক্ষী হয়েছে।’
উন্নয়ন কোথায়?— প্রশ্ন তুলছে বিজেপি। বজবজ পুরসভা এলাকার বহু জায়গায় এখনও পানীয় জলের সমস্যা প্রকট। গরম পড়লেই ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে। বিজেপি প্রার্থী তরুণ আদক বলেন, ‘সকালে পানীয় জল স্বচ্ছ থাকে। বিকেলের পর তা রং বদলে ঘোলাটে হয়ে যায়। তৃণমূলের মতোই অবস্থা। বাইরে থেকে স্বচ্ছ মনে হলেও গোটা দলটা দুর্নীতিতে কলুষিত। তৃণমূলের দাদাগিরিতে অতিষ্ঠ মানুষ। তাঁরা পরিত্রাণের পথ খুঁজছেন। এই নির্বাচনে বদল দেখবে বজবজ।’
পরপর দু’টি বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে আসন রফার সূত্র মেনে এই কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছিল কংগ্রেস। ২০১৬ সালে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী অশোক দেব। সেবার ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে জোর টক্কর দিয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু, ২০২১ সালে এই চিত্র বদলায়। ওই বছরে বিজেপি প্রায় ২৫ শতাংশ ভোট পায়। তৃতীয় স্থানে নেমে যায় কংগ্রেস। উলটোদিকে ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রায় ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন অশোক দেব।