প্রশ্ন করলেই বেআব্রু হতে হচ্ছে সরকারকে। অতএব আর কোনো রাখঢাক নয়। ভারতীয় নাগরিকদের তথ্য জানার অধিকার (আরটিআই)-এর প্রায় মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিতে এবার আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে মোদি সরকার। অথচ সরকারি কাজে স্বচ্ছতা আনতে প্রশাসনকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার অধিকার দিতেই কুড়ি বছর আগে ২০০৫ সালে এই আইন তৈরি হয়েছিল। ইতিহাস বলছে, বহু সাড়া ফেলে দেওয়া দুর্নীতি, সরকারি কাজে অস্বচ্ছতার ছবি দিনের আলো দেখেছে এই আইনের হাত ধরেই। আর এতেই ভাবমূর্তি রক্ষার সমস্যা ও বিপদের গন্ধ আঁচ করে আইনটির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে শুরু করেছে দিল্লির সরকার। প্রথমে ২০১৯ সালে তথ্য কমিশনের মতো স্বাধীন সংস্থার কমিশনারদের কাজের মেয়াদ ও বেতনের উপর নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয় সরকার, যার পরিণতিতে কমিশন কার্যত এক আজ্ঞাবহ সংস্থায় পরিণত হয়। কমিশনকে একটি অকেজো জড়পদার্থে পরিণত করতে গত দু’ বছর ধরে এই সংস্থা দু’জন মাত্র আধিকারিককে নিয়ে চলছে। মুখ্য তথ্য কমিশনার সহ সাতজন কমিশনারের পদ শূন্য রাখা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। এই আইনে তথ্য জানার অধিকারকে সংকুচিত করতে ২০২৩ সালে ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইন আনে সরকার। গোপনীয়তা রক্ষার নামে এবার এই আইনে ফের লাগাম পরাতে উদ্যত মোদি সরকার। সম্প্রতি অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করে সরকারের কাছে এমনই সুপারিশ করেছে অর্থমন্ত্রক। সুপারিশের কথায়, সরকারের গোপনীয় তথ্য নিয়ে ‘অহেতুক কৌতূহলে’ রাশ টানা প্রয়োজন। অহেতুক বাড়তি তথ্যের প্রকাশ প্রশাসনিক কাজের গতিকে থমকে দিচ্ছে। অতএব ২০০৫ সালের আইন ‘পুনর্বিবেচনা’ করার সময় এসেছে।
তার মানে, পাকাপাকি ‘মৃত’ ঘোষণার আগে আরো এক দফা নাগরিক অধিকার হরণের পরিকল্পনা। আসলে ভয় পেয়েছে সরকার। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আইনসভায় প্রশ্ন করে যা জানতে পারেন, একজন সাধারণ নাগরিকও এই আইনের বলে সরকারের থেকে তা জানতে পারার অধিকারী। এই আইন প্রয়োগের জন্য নাগরিককে অনেক সময় আদালতেও যেতে হয় না। যে কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এই আইনের অধীনে নাগরিকের থেকে প্রশ্ন পেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তার উত্তর দিতে বাধ্য থাকেন। সুতরাং এমন একটি আইন যে মোদি সরকারের পছন্দ হতে পারে না, তা এই সরকারের দৈনন্দিন কাজের ধরনেই স্পষ্ট। তাই একদিকে যেমন আইন সংশোধন করে কমিশনের স্বাধীন সত্তা কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হচ্ছে, তেমনই সাধারণ মানুষের অধিকারের পায়েও বেড়ি পরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত। এবং এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই গোটা দেশের ২৬ হাজারের বেশি আরটিআই আবেদনের জবাব মেলেনি। পাশাপাশি, আবেদনকারীদের সবক শেখাতেও মোদি সরকার পিছুপা হয়নি। দেখা গিয়েছে, যেসব নাগরিক এই আইনের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন দুর্নীতির তথ্য ফাঁস করেছেন, তাঁদের অনেকের উপর নেমে এসেছে প্রাণঘাতী আক্রমণ। মোদি জমানায় এমন অন্তত ১০০ জন আবেদনকারী নাগরিক খুন হয়েছেন, আড়াইশো জনেরও বেশি শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রায় সমসংখ্যক নাগরিককে ভয় দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছে কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্ট।
প্রত্যাশিতভাবেই আরটিআইকে ধীরে ধীরে ঠুঁটো করে দেওয়ার পিছনে মোদি সরকারের আসল উদ্দেশ্য দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা বলে আঙুল তুলেছে বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, ১) এই আমলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘সম্পূর্ণ’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে’ এমএ ডিগ্রি নিয়ে সরকারকে তথ্য প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিল তথ্য কমিশন। ২) দেশে কোটি কোটি জাল রেশন কার্ড রয়েছে বলে মোদির দাবি আরটিআই-এর আবেদনের উত্তরে ‘ভুল’ বলে জানিয়েছিল তথ্য কমিশন। ৩) প্রধানমন্ত্রীর নোট বাতিলের ঘোষণার মাত্র চার ঘণ্টা আগে রিজার্ভ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় বোর্ড এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, নোট বাতিল কোনোভাবেই কালো টাকা বা জাল নোট রোধে সাহায্য করবে না, তা জানা গিয়েছিল আরটিআই-এ আবেদনের প্রেক্ষিতে। ৪) আরটিআই আবেদনের ভিত্তিতেই তথ্য কমিশন জানিয়েছিল, দেশের শীর্ষ ২০টি ঋণখেলাপি সংস্থার নাম রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। ৫) ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে মোদি প্রতিশ্রুতি দিলেও বিদেশ থেকে কোনো কালো টাকা ফিরে আসেনি বলে জানায় তথ্য কমিশন। বলাই বাহুল্য, আরটিআইয়ের সুবাদে নাগরিকদের এমন গূঢ় প্রশ্ন এবং তথ্য কমিশনের এমন পর্দা ফাঁস করে দেওয়াটা ভালো চোখে দেখেনি মোদিবাহিনী। তাই তথ্যের অধিকার আইনকে দাঁত-নখহীন করে দিয়ে চিরতরে নির্বাচনে পাঠানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। যা আসলে নাগরিকদের আইনি অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ। এখন যুক্তি খাড়া করে বলা হচ্ছে, গোপন সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে আসা থেকে আটকাতে মন্ত্রীদের হাতে ক্ষমতা থাকা উচিত। তাই ‘কোনো প্রশ্ন নয়’— এটাই চায় মোদি সরকার।