


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার হাত ধরেই এগচ্ছে সভ্যতা। শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র নয়, জনসাধারণের দৈনন্দিন কাজের দুনিয়াতেও প্রবেশ করছে এআই। মানুষের কর্মস্থলে এই প্রযুক্তি অভিশাপ বয়ে আনছে কি না, তা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু প্রকৃতির যে বিলক্ষণ সর্বনাশ হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের মতে, অনাবৃষ্টি, বন্যা, হড়পা বান, মেঘভাঙা বৃষ্টি বা অকাল বর্ষণের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এআই। পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ফলে এখনই রাশ না টানলে বিশ্ব উষ্ণায়নের অন্যতম কাণ্ডারি হয়ে উঠতে পারে এই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা।
কেন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে চলেছে এআই? ধীরুভাই আম্বানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রসেনজিৎ মজুমদারের কথায়, এআইয়ের সুবিধা প্রদানকারী বিশ্বের তাবড় সংস্থাগুলির ‘ক্লাউড’ যে মেশিনগুলিতে জমা থাকে, তা থেকে প্রবল তাপ ও কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। ডেটা সেন্টারগুলি ঠান্ডা রাখতে যে পরিমাণ জলের প্রয়োজন হয়, তা কল্পনারও অতীত। নামি সংস্থাগুলি তাদের জিপিইউ মেশিনগুলি নিজেদের দেশে না রেখে ফিনল্যান্ডের মতো ঠান্ডা দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আন্টার্কটিকায় হিমবাহের গলন এই মেশিনগুলির তাপ বিকিরণের কারণেই কি না, তা নিয়েও গবেষণা শুরু হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এই সংক্রান্ত পরিকাঠামো চালু রাখতে যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, তা গোটা বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ খরচের প্রায় ১.৩ শতাংশ। অর্থাৎ একটা গোটা দেশে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তারই সমতুল বিদ্যুৎ লাগে এআইয়ের জন্যও। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের হাত ধরে যেভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়ছে, সেই গতিকে ত্বরাণ্বিত্ব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে এআই।
কলকাতায় বসে এর বিরোধিতায় ‘আন্দোলন’ শুরু করেছেন প্রসেনজিৎবাবু। তাঁর কথায়, ২৫ বছর আগে গবেষণার বিষয় হিসেবে এআইকে বেছে নিয়েছিলাম। তখন এই প্রযুক্তির বহিঃপ্রকাশ আজকের মতো ছিল না। কিন্তু এই ক’বছরে আমূল বদলে গিয়েছে পরিস্থিতি। যাবতীয় প্রাকৃতিক ক্ষতিসাধনকারী এআইকে তকমা দেওয়া হয়েছে ‘রেড এআই’ নামে। এর বিরোধিতাও শুরু হয়েছে বিশ্বের সর্বত্র। বিশেষত ইউরোপে। বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে ‘গ্রিন এআই’। বড় বড় সংস্থাগুলির ‘ক্লাউড’-এর বাইরে গিয়ে যদি ‘এজ’ ভিত্তিক এআই ব্যবহৃত হয়, তাহলে দূষণ কমবে বলে দাবি প্রসেনজিৎবাবুর। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভারতের মতো বড় দেশে প্রচুর ভাষা-উপভাষার মানুষ বাস করেন। তাঁরা সবাই যে ইংরেজি জানবেন, তা নাও হতে পারে। যদি প্রতিটি সংস্কৃতি ও ভাষানির্ভর গোষ্ঠীকে নিজস্ব প্রয়োজনে এআই ব্যবহার করতে হয়, তাহলে বড় সংস্থার তরফে রেড এআইয়ের প্রয়োজন নাও পড়তে পারে। ফলে বিদ্যুৎ বা জলের প্রয়োজন পড়বে না। বহু মানুষ একসঙ্গে সহজে, কম খরচে পরিবেশবান্ধব এআইয়ের সদ্ব্যবহার করতে পারবেন। কতটা সাশ্রয়ী গ্রিন এআই? হিসেব বলছে, যদি কোনও ব্যক্তি এআই নির্ভর আইনি পরামর্শ চান, তাহলে রেড এআইয়ে তাঁর খরচ মাসিক ২০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু গ্রিন এআই সেই পরিষেবাই দিতে পারে মাত্র ২০০ টাকায়।
এআই, বিশেষত গ্রিন এআইকে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে সওয়াল করেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাসিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মন্দার মিত্র, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্সের অধ্যাপক দেবর্ষি সান্যাল, অধ্যাপক আদিনাথ সরকার, শিল্প বিশেষজ্ঞ কৌস্তভ দত্ত প্রমুখ বিশিষ্টরা।