স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: সম্প্রতি বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একটি অভিনব ঘটনা ঘটছে। বলতে গেলে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। তিনি তাঁর সাম্প্রতিকতম সিনেমাটি রাজ্যের বিভিন্ন থিয়েটার হলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন। যা অভূতপূর্ব। কেন এই অভিনব পন্থা অবলম্বন করলেন পরিচালক এবং তার প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করার আগে সিনেমা ব্যবসার খোলনলচে সম্পর্কে একটু জানা দরকার।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একবার ইংরেজ নাটককার অ্যান্থনি শ্যাফারের বিখ্যাত নাটক ‘স্ল্যুথ’ অবলম্বনে একটি ছবি পরিচালনা করবেন বলে ভেবেছিলেন। এই গল্প নিয়ে ১৯৭২ সালে একটি ইংরেজি সিনেমাও তৈরি হয়েছিল। ছবির কাহিনি মাত্র দু’টি চরিত্রকে ঘিরে আবর্তিত। ইংরেজি সিনেমাটিতে সেই দু’টি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন স্যার লরেন্স অলিভিয়ার ও মাইকেল কেইন। সৌমিত্র অলিভিয়ার অভিনীত চরিত্রে উত্তমকুমারকে ভেবেছিলেন এবং অপর চরিত্রটি নিজেই করবেন ঠিক করেছিলেন। কিন্তু ছবির প্রস্তাব নিয়ে সেই সময়ের বাঘা এক প্রযোজকের কাছে যেতে তিনি গল্প শুনে প্রায় আঁতকে উঠেছিলেন। গল্পে নাচ নেই, গান নেই, কোনো মহিলা চরিত্র নেই, এ ছবি চলবে না মশাই। এই বলে প্রযোজক তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ অবধি সে ছবি হয়নি। আসলে একটা সময়ে সিনেমা বানানো ছিল খরচ সাপেক্ষ। প্রযোজকরা টাকা ঢালার আগে নিশ্চিত হতে চাইতেন মুনাফা হবে কি না, সে বিষয়ে। তাই পরীক্ষা নিরীক্ষার পথে হাঁটতে চাইতেন না। এই কারণেই উনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক জাঁ ককতো বলেছিলেন, ফিল্ম যেদিন কাগজ পেনসিলের মতো সস্তা হবে, সেইদিন সিনেমা সত্যিকারের শিল্প হয়ে উঠবে। তা কাগজ পেনসিলের মতো সস্তা না হলেও আগের তুলনায় সিনেমা বানানোর খরচ অনেকটাই কমেছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে এখন মোবাইল ফোন দিয়েও সিনেমা বানানো যায়। কিন্তু তারপর? ছবি তো তৈরি হল। এবার সে ছবি দর্শককে দেখানোর পালা। তার জন্য একাধিক হলে ছবিটি রিলিজ করতে হবে। এইখানে এসেই বহু চলচ্চিত্র নির্মাতা আটকে যান। ছবির প্রযোজককে এক বা একাধিক ডিস্ট্রিবিউটর বা পরিবেশক নিয়োগ করতে হয়। এই পরিবেশক ছবিটি বিভিন্ন হলে চালানোর ব্যবস্থা করেন। এই জায়গায় এসেই আটকে যায় বহু ছবি। যেমন, ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ তাঁর জীবদ্দশায় মুক্তি পায়নি।
কেন এই জটিলতা? একদা মূলধারার বাংলা ছবির এক প্রযোজক, যিনি অনেক বছর হল প্রযোজনা করেন না, তিনি বললেন, প্রথম কথা হল খরচ। মোটামুটি চার-পাঁচটা হলে রিলিজ করতে গেলেও ন্যূনতম চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ আছে। তাছাড়া অন্য আরও সমস্যা আছে। ছবি যদি পরিবেশক এবং হল মালিকদের পছন্দসই না হয়, অর্থাৎ যদি তাঁদের মনে হয় যে এ ছবি দেখতে লোক হলে আসবে না, তবে তাঁরা ছবি চালাতে চান না। চালালেও প্রচুর টাকা দাবি করে বসেন। একই ঘটনা ঘটে মাল্টিপ্লেক্সেও। এমনিতেই মাল্টিপ্লেক্সগুলি টিকিট বিক্রির টাকার অর্ধেক পরিবেশককে দেয়। ছবির ‘মেরিট’ নিয়ে সন্দেহ থাকলে পরিবেশককে টিকিট বিক্রির টাকার শতকরা চল্লিশ ভাগ বা তারও কম অফার করে। তার উপর প্রাইম টাইমে শোও দিতে চায় না। এই ধরনের বেশিরভাগ ছবিই সকালে বা রাতের শেষ শো পায়। ফলে ছবি যদি ‘প্যারালাল ফিল্ম’ গোত্রভুক্ত হয়, তবে সে ছবি রিলিজ করা খুবই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
এই জটিলতা, পাহাড় প্রমাণ বাধা এড়াতে পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য এক অভিনব কৌশল নিয়েছেন। যা এক কথায় বলতে গেলে বৈপ্লবিক। তিনি তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবিটি চিরাচরিত সিনেমা হলে রিলিজ না করিয়ে জেলায় জেলায় থিয়েটার হল ভাড়া করে একটি বা দু’টি করে বিশেষ শোয়ের ব্যবস্থা করছেন। তাঁর এই পদক্ষেপ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির খোলনলচে বদলে দিতে পারে। ইতিমধ্যে কলকাতা সহ রাজ্যের একাধিক জায়গায় এইভাবে ছবিটি দেখানো হয়ে গিয়েছে। এরপর আরও বহু জায়গায় তাঁদের ছবিটি দেখানোর কথা। কলকাতার তপন থিয়েটারে ছবিটির হাউসফুল শোয়ের পর ফের জ্ঞান মঞ্চে দেখানো হবে বলে ঠিক হয়েছে। প্রতিটি জায়গাতেই ভীষণ ভালো সাড়া পেয়েছেন বলে দাবি প্রদীপ্তর। কিন্তু চিরাচরিত ‘রিলিজ চেন’ ছেড়ে এইভাবে ছবি দেখানোর প্রয়োজন হল কেন। প্রদীপ্তর বক্তব্য, সিনেমা হলে কমার্শিয়ালি রিলিজ করতে যা খরচ হয়, অত টাকা নেই তাঁর প্রযোজকের কাছে। ছবিটিও তাঁরা করেছেন খুবই অল্প খরচে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘শ্যু স্ট্রিং বাজেট’। অর্থাৎ শুরুতেই ছবি রিলিজ করার যেসব সমস্যার কথা আলোচনা করা হয়েছিল, সেইসব সমস্যা এড়াতেই প্রদীপ্তর এই নয়া ভাবনা। এই বাংলায় এরকম ঘটনা এর আগে ঘটেছে বলে ফিল্ম বোদ্ধারা কেউই মনে করতে পারছেন না। তবে বাংলায় না ঘটলেও দক্ষিণ ভারতে এরকম একাধিক প্রয়াস আগেও হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ঋত্বিক ঘটকের অন্যতম প্রিয় ছাত্র জন আব্রাহাম ‘ওডেসা কালেক্টিভ’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করে গ্রামে গ্রামে পর্দা খাটিয়ে ছবি দেখিয়ে বেড়াতেন। এ ঘটনা সেই ১৯৮৪ সালের। সাধারণ মানুষের থেকে চাঁদা তুলে, যাকে বলে ‘ক্রাউড ফান্ডিং’, সেইভাবে ছবি বানাতেন। ওডেসা কালেক্টিভের উদ্যোগই তৈরি হয়েছিল জনের বিখ্যাত মালায়লাম ছবি ‘আম্মা আরিয়ান’ (রিপোর্ট টু মাদার)। জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল (স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড) সে ছবি। ১৯৮৭ সালে জন এক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তথ্যচিত্র নির্মাতা সিভি সত্যেন ওডেসা কালেক্টিভের হাল ধরেন। কিন্তু খুব বেশিদূর যেতে পারেনি এই ফিল্ম মুভমেন্ট। সিভি সত্যেনও ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ওডেসা কালেক্টিভ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু একই পথ ধরে দক্ষিণ ভারতে পরবর্তীকালে তৈরি হয়েছে এ ধরনের বহু সংগঠন। তার মধ্যে সবচেয়ে সফল বাবু গঙ্গাধরনের উদ্যোগ গড়ে ওঠা ফিল্ম কালেক্টিভ ‘ফিল্মোক্রেসি’। ২০১২ সালে গড়ে ওঠা এই সংগঠনের উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত প্রায় ২০টি ছবি তৈরি হয়েছে এবং তারমধ্যে কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার সহ নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছে। আসলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও তথাকথিত ‘বাজার’-এর অন্তর্ভুক্ত। আর বাজার সবসময়ে চায় শিল্পীকে কেটেছেঁটে নিজের মাপসই করে নিতে। কেউ বাজারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, কেউ করেন না। যেমন ঋত্বিক ঘটক করেননি। জন আব্রাহাম করেননি। তেমনি প্রদীপ্তও করেননি। এর আগেও প্রদীপ্ত ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ করেছেন। তাঁর ওয়েব সিরিজ ‘বিরহী’ কোনো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে রিলিজ না করিয়ে তিনি ইউটিউবে রিলিজ করেছিলেন। যাতে মানুষ বিনা পয়সায় তা দেখতে পারেন।
প্রদীপ্ত ছবি দেখানোর যে পন্থা বেছে নিয়েছেন, তা যদি আরও কিছু পরিচালক এবং প্রযোজককে উৎসাহিত করে এবং তাঁরা যদি প্রচলিত ব্যবস্থা এড়িয়ে দর্শকের কাছে ছবি পৌঁছে দিতে পারেন তবে প্রচলিত ব্যবস্থার নাভিশ্বাস উঠতে বাধ্য। এমনিতেই একাধিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাবে পুরনো ব্যবস্থা বেশ চাপে পড়ে গিয়েছে। এখন দেখার এই নয়া কৌশল অন্যান্য পরিচালক প্রযোজকদের কতটা উৎসাহিত করতে পারে।