সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা: জীবনটা ভীষণ অদ্ভুত। নিরন্তর ছুটে চলা। এভাবেই চলতে চলতে ব্যস্ততার তাড়নায় পিছনের দিকে তাকাতে ভুলে যাই আমরা। ভুলতে বসি অতীত। মাঝেমধ্যে ক্ষণিকের অবসরে এসব কথা হয়তো মনে পড়ে। কিন্তু ফের সময়ের তাড়নায় ব্যস্ত হয়ে উঠি চলতি হাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতেও পিছনে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। আমাদের অতীত সম্পর্ক, অনুভূতিকে সঙ্গেনিয়েএগিয়ে চলার বার্তা দিচ্ছে দক্ষিণপাড়া দুর্গোৎসব কমিটি। তাদের ভাবনা ‘প্রবাহী’র মধ্যে দিয়ে। শিল্পী দেবাশিস বারুইয়ের কথায়, ‘প্রবাহী’শুধু স্রোত বা গতি নয়, একটা চলমানধারা। এই ভাবনার সূত্রপাতও দক্ষিণপাড়ায় পুজো করার সুবাদে। কাজের পথে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা। তা পেরিয়ে আমরা নান্দনিকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুঝতে পেরেছি, এই যাত্রাও ঠিক জীবনেরই মতো। কোথাও পৌঁছনোর জন্য আমাদের নানা বাধা অতিক্রম করতে হয়। এই যাত্রাপথে যে নিরন্তর সংগ্রাম, সেকথাই ফুটে উঠেছে এবারের ভাবনায়।
গলিপথে সিঁড়ি বেয়ে মণ্ডপে পা রাখার আগে থেকেই চারপাশের আবহে মিলবে ভাবনার ছোঁয়া। সেই আবেশ গায়ে মেখে স্বপ্নের এক দুনিয়ায় পা রাখবেন দর্শকরা। ত্রিস্তরীয় এই মণ্ডপসজ্জার প্রথমেই রয়েছে একটি অপূর্ব কারুকার্যখচিত দরজা। সেই দরজা পেরিয়ে মানুষ পা রাখবেন স্বপ্ন-জগতে। মাথার উপরে বাজছে একের পর এক ঘণ্টা। দু’পাশে ফুটেছে গোলাপ।আরও কিছুটা এগিয়ে মূল অঙ্গনে পৌঁছতে গেলে পেরতে হবে চারটি ধাপ। এই পর্বে প্রতিটি মোড়ে পৌঁছে মানুষ পিছনে ফিরে তাকিয়ে তাঁর অতীত যাত্রাপথ দেখতে পারবেন। সামনে সপরিবারে মা দুর্গা দেখছেন আমাদের এই গোটা যাত্রাটিকে। এবারের ভাবনা বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে সমস্ত মানুষের মন ছুঁয়ে যাবে বলে আশাবাদী পুজোর সম্পাদক রাজীব চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেখানো পথে দুর্গাপুজোকে বিশ্বজনীন করার পথে আমাদের এই প্রয়াস। শহর থেকে গ্রাম— সর্বস্তরের মানুষের ভাবনাকেএকসূত্রে বাঁধবে ‘প্রবাহী’।
এই বাংলার লোকপার্বণের দেখা মিলবে দমদম পার্ক যুবকবৃন্দের পুজোয়। শিল্পী অরুণ সরকারের কথায়, বাঙালির ১২ মাসে ১৩ পার্বণ। সারা বাংলার সেই সমস্ত পার্বণকেই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে আমাদের পুজোমণ্ডপে। পটচিত্র, খোদাই করা কাঠের মূর্তির মতো বিভিন্ন মাধ্যমে। প্রবেশপথের গেটে থাকছে পুতুল নাচের উল্লেখ। সামনেই রয়েছে একটি ধানের গোলা। নবান্ন উৎসবকে বোঝাতে। শ্রাবণ মাসে তারকেশ্বরে জল ঢালার রীতি আমাদের দীর্ঘকালের। সেই পর্বটি ধরা পড়বে পরপর রাখা জলের বাঁকের মধ্যে দিয়ে। থাকছে চরক গাছ। টুসু পরব সহ নানা উৎসব ফুটে উঠবে পটচিত্রের মধ্যে দিয়ে। মাঠের চারধারে ছড়িয়ে থাকা এই নানান পার্বণের মাঝে রয়েছে বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব—দুর্গাপুজো।
মাতৃমূর্তিতেও থাকবে বাংলার কৃষ্টির ছোঁয়া। যুগ্ম সম্পাদক প্রেমাংশু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, আমাদের এবারের পুজো ভাবনায় আধুনিকতার সঙ্গে মিশে যাবে গ্রাম-বাংলার অতীত-ঐতিহ্য।