বাংলার সুপ্রাচীন লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অঙ্গ যাত্রাপালা। তার উৎস ও বিস্তারের ইতিহাসও সুদীর্ঘ। যাত্রার ক্রমবিবর্তন সমাজের একটা বড় অংশকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছে। একথা হলফ করেই বলা যায়, কলকাতার যাত্রা নিয়ে মানুষের আগ্রহ আজও প্রবল। একটা সময় কলকাতার ঘরে ঘরে শুরু হয়েছিল যাত্রার সফর। প্রখ্যাত বেহালাবাদক প্যারীমোহন ছিলেন বরানগরের বাসিন্দা। ভবানীপুরের বেলতলায় তিনি একটি যাত্রার দল খুলেছিলেন। তাদের দু’টি যাত্রা, ‘বিদ্যাসুন্দর’ ও ‘নলদময়ন্তী’ খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল। প্যারীমোহনের অনেক জনপ্রিয় গানের মধ্যে অন্যতম—‘আমি আর যাব না তোমার সনে, তুমি ফচকে মেয়ে/ পুরুষ দেখলে অমনি থাক তাঁর পানেতে চেয়ে...।’ কলকাতার ছাতুবাবুর দেওয়ান রামচাঁদ মুখোপাধ্যায়ও ১৮৪৯ সালে একটি যাত্রাদল তৈরি করেন। জোড়াসাঁকোর বারাণসী ঘোষের বাড়িতেও বসত যাত্রার আসর। এক সন্ধ্যায় তো দর্শক সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার! সেখানকার বীরসিংহ মল্লিকেরও ছিল একটি শখের যাত্রাদল। সিঙ্গুরের ভৈরবচন্দ্র হালদারকে দিয়ে একাধিক যাত্রা গান লিখিয়ে ছিলেন তিনি। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকটির যাত্রারূপ দিয়েছিল কলকাতার দ্বারকা মল্লিকদের দল। রবীন্দ্রনাথের মেজ কাকা গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত একটি শখের যাত্রাদল তৈরি করে ছিলেন। তিনি নিজে পালা লিখতেন। চিৎপুর হাড়কাটা অঞ্চলে ঘড়ি ব্যবসায়ী ছিলেন দুর্গাচরণ ঘড়িয়াল। তিনিও দল গড়ে সুনামের সঙ্গে ‘চণ্ডীযাত্রা’ মঞ্চস্থ করতেন। নাচিয়ে হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন বাগবাজারের ঝড়ু দাস। তাঁর দলের ‘কমলে কামিনী’ পালাটি সাড়া ফেলে দেয় একসময়। রাধাবিনোদিনী ছিলেন একজন বারবণিতা। নিমতলা অঞ্চলে যাত্রাদলের গদি তিনি তৈরি করে ছিলেন। মূলত মেয়েরাই অভিনয় করতেন তাঁর দলে। ১৮৬৭ সালে কিছু উৎসাহী যুবককে নিয়ে বাগবাজারে একটি যাত্রাদল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ স্বয়ং। বউবাজারে অক্রুর দত্তের দল, কলকাতার নবীন ডাক্তার, শ্রীনাথ সেনের শখের যাত্রাদলের সুনামও কম ছিল না।



