


আগামী কাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ৮ মার্চ আসে আর যায়। কিন্তু মেয়েদের জীবনে কিছু বদল সমাজ ঘটাতে পারে কি? বিয়ের বিভিন্ন আচারেই তো তাঁদের অবমাননা! লিখছেন রোহিণী ধর্মপাল।
মালতি রগড় দেখে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসছিল। আশপাশ থেকে যারা নতুন বউ দেখতে এসেছিল ভিড় করে, তারাও হেসে ফেলছিল। আর পায়েল? একে তো বাড়ি ছেড়ে আসার প্রবল যন্ত্রণা তার এখন সঙ্গী, তার উপর এতটা পথ এসেছে, যতই এসি গাড়ি হোক— জবরজং বেনারসি আর গয়না পরে ক্লান্ত ও বিধ্বস্ত তো বটেই। তার উপর প্রথমে ঢুকেই দেখা গেল পাথরের উনুনে দুধ উথলে উঠছে। শাশুড়ি মা জিজ্ঞেস করলেন, বউমা, কী দেখছ? পায়েল বেচারি ভাবল, উনি বোধহয় জানতে চাইছেন দুধ উথলে উঠলে কী করতে হয়!
সে তাড়াতাড়ি বলে উঠল মা, জল দিন, দুধ আর উথলে উঠবে না! বলামাত্র চারদিকে যেন হাসির রোল উঠল। পাশে দাঁড়িয়ে পায়েলের বর পার্থ পর্যন্ত হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগল। তড়িঘড়ি পার্থর পিসিমা বললেন, এও জানো না মা! বলতে হয়, আমার সংসার উথলে উঠেছে। এই শহুরে মেয়েদের নিয়ে এই মুশকিল! নাও, বলো এবার। পায়েল বোকার মতো বলে উঠল, আমার সংসার উথলে উঠেছে। ভীষণ বোকা বোকা লাগছিল তার। আর তারপর এই জলভরা কলসি তোলা। এমন কিছু বড়ো কলসিও নয়। তাও যে কেন তুলতে হিমশিম খাচ্ছিল বুঝতে পারছিল না সে। ঘেমেনেয়ে একসা হয়ে যাচ্ছিল। আর পার্থ মায়ের সুপুত্রের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেন মজা দেখছিল। হঠাৎ কোথা থেকে মাসতুতো ননদ তিন্নি এসে তার হাত থেকে কলসিটা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলল। পায়েল অবাক হয়ে দেখল, কলসিটা ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছে। তার চারদিকে জল আর তার মধ্যে ভারী কয়েকটা পাথর। সবাই এবার হাঁ হাঁ করে উঠল।
এটা কী হল!
বেশ করেছি! তোমাদের এইসব ফালতু আচারের কোনো মানে হয় না! শুধু শুধু বেচারা মেয়েটাকে জব্দ করা!
তিন্নির মতো দরদি ননদ সবজায়গায় না থাকলেও এমন সব নিয়ম এখনও বহু জায়গাতেই আছে। বহাল তবিয়তে। ল্যাটামাছ ধরা থেকে চালভর্তি কলসি ফেলা, সেসব কাজে কে কতটা ভালো করে উতরোল, তার ফলাফলের ওপর বউমার কয়েকটা দিন ভালো যাবে না খারাপ যাবে, তা স্থির হবে!
এই যেমন কনকাঞ্জলি। বিয়ের পর দিন নতুন বাড়ি মানে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে পিছন দিকে না তাকিয়ে চাল ছুড়ে দেওয়া, মা বাবার উদ্দেশ্যে। কী! না মা বাবার ঋণ শোধ করে যেতে হবে। পড়ে মনে হচ্ছে না, কী ভীষণ অশালীন! আমরা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষরা আসলে ঠিক করে দিই শ্লীল অশ্লীল কোনগুলো! অথচ এই ধারণাগুলিই কি অশ্লীল নয়?
বছরখানেক আগেই গয়নার মস্ত বড়ো এক ব্র্যান্ড এই কনকাঞ্জলির ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন করেছিল। ফেসবুকে কেউ ভাইরাল হয়েছিল শুধু এই বলে, ‘তোমাদের ফ্রায়েড রাইসের চাল দিয়ে গেলাম!’ এই কিম্ভূতকিমাকার আর অসহনীয় প্রথাগুলিকে আমরা এখনো প্রশ্ন করতে শিখছি না। বরং বহুক্ষেত্রে নারীকে অপমানিত হতে দেখেও প্রথাগুলিকে মহিমান্বিত করা হচ্ছে।
যে বিবাহ সূক্ত থেকে মন্ত্র নিয়ে অনুষ্ঠান করা, সেটি এক নারী ঋষি সূর্যার রচনা। আমরা সেটা পর্যন্ত জানি না। আর বলি, মেয়েদের ওঁ উচ্চারণ করা নিষেধ! অনেকেই জানেন নয়ের দশকে পুরীর শঙ্করাচার্য এসেছিলেন কলকাতায়। তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে যে অনুষ্ঠান হয়েছিল, তাতে প্রথমেই ছিল বেদমন্ত্র। পাঠ করছিলেন অরুন্ধতি রায়চৌধুরী। তাঁকে ওঁ উচ্চারণ করতে দেখে মহামহিম পুরুষটি উঠে তীব্র স্বরে প্রতিবাদ জানান। এবং একজন প্রতিষ্ঠিত গায়িকাকে নেমে যেতে বাধ্য করা হল।
আর কী আশ্চর্য, এতদিন ধরে ভারতীয় পুরুষরাই, পৈতে আছে এমন পুরুষরাই না জেনে এক নারীর লেখা মন্ত্র পাঠ করে বিয়ে দেওয়ার কাজ করছেন আর প্রতি ক্ষেত্রে নারীকেই অবমাননা করছেন।
আসলে আমরা কেউ পড়ি না। জানি না। তাই যা খুশি তাই আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ। ঋগ্বেদের বিবাহ-সূক্তে কোথাও বলা নেই কোন মন্ত্রের সঙ্গে কোন ক্রিয়াটি করতে হবে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংহিতা এই সংযোজনগুলি করে। এবং পিতৃতান্ত্রিকতার বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে অধিকাংশ মন্ত্রই বরের জন্য প্রস্তুত করা হয়। অধিকাংশ ক্রিয়াতেই বর অর্থাৎ পুরুষটিই প্রধান। বধূর কাজ হল সেজেগুজে অলংকার ভূষিত হয়ে মাথা নীচু করে বরের অনুগমন করা।
পানপাতা দিয়ে মুখ ঢেকে পিঁড়িতে চেপে টলমল করতে করতে বধূ আসে শুভদৃষ্টির জন্য। যে কোনো পাতাকেই প্রজননের প্রতীক বলে ধরা হয়। আসলে বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির শুরুই তো সন্তান উৎপাদনের জন্য, যাতে সেই বংশধরের হাতে পিতার বংশের সম্পদ সঞ্চালিত করা যায়। তাই মেয়েটি নয়, তার গর্ভই যেন এখানে আসল। বিয়েতে পানপাতা দিয়ে মুখ ঢেকে আসার কারণটিও সেই একই। সৌন্দর্যের আবরণ, প্রথার আবরণ দিয়ে মুড়ে আসলে মেয়েদের অবনমিত করা হয়ে চলেছে। অর্থ না জেনে মেয়েরাও তাতে তাল দিয়ে চলেছে।
‘বিবাহ’ শব্দটির অর্থ হল বিশেষ রূপে বহন করা। মেয়েটি পুরুষটির সন্তান ধারণ করবে। পুরুষটি মেয়েটির খাওয়াদাওয়া পরিধানের দায়িত্ব নেবে। এই বহন করা থেকেই এখনও চলে আসছে বিয়ের পরের দিন ভাতকাপড় দেওয়ার বিশ্রী প্রথাটি। শুধু মেয়েরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে বলেই নয়, বাইরের কাজ না করলেও তো মেয়েটি সংসার ধরে রাখে। আগলে রাখে স্নেহে, মায়ায়, মমতায়। এবং দিনরাতের পরিশ্রম দিয়ে। সে না থাকলেও তো সংসার চলবে না। তাহলে ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব মানে কী! এ তো যেন বিনি পয়সার দাসীর ব্যবস্থা জিইয়ে রাখা! পেট আর পরনের ব্যবস্থার চুক্তিতে তোমায় আমি আমার করে নিলাম। আর এই প্রথা ছেলে মেয়ে উভয়েই মহানন্দে পালন করছেন!
প্রতি বছর ধূমধাম করে নারী দিবস পালন হয়। তাতে পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বৃদ্ধি ছাড়া আর বিশেষ কিছু হয় কি! মাঠে ঘাটে হাটে বাজারে ঘর্মাক্ত হয়ে কাজ করা মেয়েদের জন্য, বাসে ট্রামে হেঁটে কাজ করতে বেরনো মেয়েদের জন্য শৌচালয় পর্যন্ত নেই! বহু স্কুলেও একই অবস্থা। সেই কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন, আমরা এখনও সেই সমস্যারই সমাধান করে উঠতে পারিনি! আর বিবাহ অনুষ্ঠানের প্রথাগুলি ভেঙে নতুন পথে এগিয়ে চলার দিক তৈরি করা তো যেন বহু দূরের আবছায়া কোনো স্বপ্ন।
হ্যাঁ। তবু নতুন ছেলেমেয়েরা অল্প হলেও এগিয়ে আসছে। বিবাহ ভেবে নয়, প্রেমের বা মিলনের উৎসব পালন করছে। ঋগ্বেদের বিবাহ সূক্তে একজায়গায় পাণিগ্রহণের মন্ত্র আছে। আমার মা গৌরী ধৰ্মপাল বলতেন কবিতা। এমন একটি কবিতায় আছে বর বধূ নিজেরাই স্বেচ্ছায় পরস্পরের হয়ে যাচ্ছেন। সাক্ষী থাকছে শুধু সূর্য।
একদিন হয়তো এমন দিন আসবে যেদিন আইনি সই ছাড়া আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হবে না। পরস্পর পরস্পরের প্রতি ভালোবাসাটাই সেই আলো হয়ে থেকে যাবে। বিষ্ণুর মতো। বৈদিক ভাষায় বিষ্ণু মানে ‘মাঝ আকাশের সূর্য’। যে সবথেকে বেশি আলো ছড়ায়। এমন আলো এখন আরও জরুরি হয়ে উঠছে।
তমসো মা জ্যোতির্গময়।