


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ভোটপর্ব শেষ হলেই রান্নার গ্যাস নিয়ে নতুন করে সমস্যায় পড়তে চলেছেন বাংলার গ্রাহকরা। আর তার ব্লু-প্রিন্টও তৈরি করে ফেলেছে মোদি সরকার। এরাজ্যে বিধানসভা ভোটের জন্য গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের জোগান মোটামুটি সুষ্ঠু রেখেছিল কেন্দ্র। এবার তাতে সরাসরি কোপ পড়বে। আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটপর্ব মিটলেই সিলিন্ডারের জোগান ২০ শতাংশ ছেঁটে ফেলবে পেট্রলিয়াম মন্ত্রক। অর্থাৎ ডিস্ট্রিবিউটরদের গ্যাসের যেটুকু চাহিদা থাকবে, এতদিন তার ১০০ শতাংশ মেটাচ্ছিল মন্ত্রক। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে তার ৮০ শতাংশ মেটানো হবে। অর্থাৎ ডিস্ট্রিবিউটরা ১০০টি সিলিন্ডার চাইলে, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি ৮০টা দেবে। এর অর্থ, গ্রাহক ডেলিভারির ২৫ দিন পর সিলিন্ডার বুক করবেন। কিন্তু তার ডেলিভারি আর দ্রুত হবে না। বরং তার জন্যও হাতে বেশ কয়েকদিন ধরে হয়রানির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
ডিস্ট্রিবিউটরদের একাংশের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার পর থেকে গৃহস্থের গ্যাসের চাহিদার ৮০ শতাংশ জোগান দেওয়ার নিয়ম চালু রেখেছে কেন্দ্র। অন্যান্য রাজ্যে তা চালু থাকলেও ভোটের জন্য পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু সহ বিধানসভা নির্বাচন চলা রাজ্যগুলিতে তা বলবৎ হয়নি। পাছে ভোটাররা চটে যান, তাই এই পদক্ষেপ। কিন্তু ভোটের পর সেই সুবিধা আর দিতে রাজি নয় মোদি সরকার। সিলিন্ডার ছাঁটাই হবেই। ডিস্ট্রিবিউটরদের তথ্য, দেশের বিভিন্ন শহরে বুকিংয়ের পর গ্যাস মিলছে ১২ থেকে ১৫ দিন পর। বাংলাতেও এবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা। সিলিন্ডার পিছু যেভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির ক্ষতির অঙ্ক বাড়ছে, তাতে ভোটপর্ব মেটার পর ফল ঘোষণার আগেই আরও এক দফা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন ডিস্ট্রিবিউটররা। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি যে আরও সংকটের হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সিলিন্ডার ডেলিভারির পর শহরাঞ্চলে ২৫ দিন ও গ্রামাঞ্চলে ৪৫ দিন পর রান্নার গ্যাস বুকিংয়ের নিয়ম জারি রেখেছে কেন্দ্র। তা নিয়ে ভোগান্তির অন্ত নেই। গ্যাসের নতুন সংযোগ বা ডবল সিলিন্ডারের সংযোগ দেওয়ার কাজও বন্ধ। বরং চড়া দরে ৫ কেজির সিলিন্ডার খোলা বাজারে বেচে মুনাফা ঘরে তোলার ঘুঁটি সাজিয়েছে কেন্দ্র। এর উপর সিলিন্ডারের জোগান কমে গেলে সরাসরি আঘাত আসবে গ্রাহকের হেঁশেলে। গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের সক্রিয় গ্রাহকের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ তৃতীয়। মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশের পরই। প্রায় ২ কোটি ৭১ লক্ষ গ্রাহক বাংলার। প্রতি মাসে কলকাতা ও শহরতলিতেই ৫০ লক্ষ গ্যাস সিলিন্ডার দরকার হয়। সেই প্রয়োজনীয়তার ২০ শতাংশ ছেঁটে ফেললে দু’টি সিলিন্ডার ডেলিভারির মধ্যে সময়ের ফারাক অনেকটাই বাড়বে।
এরইমধ্যে মে মাস থেকে গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দাম আরও একদফা বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন ডিলাররা। তাঁদের বক্তব্য, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি পেট্রলে লিটার পিছু ২০ টাকা ও ডিজেলে লিটার পিছু প্রায় ৭০ টাকা ক্ষতি করছে। গৃহস্থের সিলিন্ডারেও প্রতিটিতে লোকসান প্রায় ৪০০ টাকা। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে লোকসানের বোঝা বেশি বাড়াতে না দেওয়ার দিকে হাঁটতে পারে কেন্দ্র। কারণ, তাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হতে থাকলে আন্তর্জাতিক স্তরে অশোধিত তেল কিনতে ঋণের সুবিধা হারাতে পারে সংস্থাগুলি। তা চাইবে না কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই সংস্থাগুলিকে আর্থিক ত্রাণ দিতে বাজেটে মোটা অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। তারপরও তারা লোকসানের একটা অংশ জনগণের উপর চাপাতে পারে, মনে করছে ডিস্ট্রিবিউটররা। তাই সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে ক্রমশ।