দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: সদ্য দলের প্রায় সাড়ে চার হাজার জনপ্রতিনিধি ও পদাধিকারীর সঙ্গে বৈঠকে অন্তর্ঘাত নিয়ে কড়া কথা শুনিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের একাধিক গোষ্ঠীর পরস্পরবিরোধী অবস্থান, কোন্দলের কারণে নির্বাচনে অন্তর্ঘাত করার তরতাজা উদাহরণই নদীয়া দক্ষিণ। বকা খেতে হয়েছে খোদে জেলা সভাপতিকেই। এবার দলের সেনাপতির হুঁশিয়ারিতে কি রানাঘাটের মাটিতে সঙ্ঘবদ্ধ হবে তৃণমূল? নাকি ছাব্বিশেও পদ্মই ফুটবে নদীয়ার গাঙ্গেয় উর্বর মৃত্তিকায়? উত্তর খুঁজছে দলেরই নিচুতলা।
২০১৯ এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে রানাঘাট কেন্দ্রে হার, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ৮টিতে পরাজয়, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে শান্তিপুর পঞ্চায়েত সমিতি এবং রানাঘাট দুই ব্লকের একাধিক পঞ্চায়েতেধাক্কা হজম করতে হয়েছে তৃণমূলকে। কল্যাণী, হরিণঘাটা, চাকদহ, রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম, রানাঘাট উত্তর-পূর্ব, রানাঘাট দক্ষিণ, শান্তিপুর, কৃষ্ণগঞ্জ— এই গেরুয়া মানচিত্র যেন ভরাডুবির ভরকেন্দ্র তৃণমূলের। মুখ রক্ষা বলতে নবদ্বীপ এবং পরেও উপনির্বাচনের শান্তিপুর এবং রানাঘাট দক্ষিণ পুনরুদ্ধার। একসময় কৃষ্ণনগর এবং রানাঘাট দুই সাংগঠনিক জেলার মাথায় সংসদ মহুয়া মৈত্রকে বসিয়েও ফল মেলেনি। কিন্তু ব্যাপক হারে হারার কারণ কী? নিচুতলারকর্মীদের বক্তব্য, ব্যাপক গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং অন্তর্ঘাতই এর কারণ। রানাঘাট ১ ব্লকের ক্ষেত্রে কর্মীদের কথায় উঠে এসেছে প্রাক্তন এক ব্লক সভাপতির নাম। নির্বাচন যা-ই হোক, তাঁর নাকি মনঃপুত প্রার্থী না হলেই অন্তর্ঘাত এবং রক্তক্ষরণ সইতে হচ্ছে দলকে! রানাঘাট ২ ব্লকে কোন্দল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একটি ব্লককে দু’ ভাগে ভেঙে দু’ জন ব্লক সভাপতি করতে হয়েছে। একই অবস্থা শান্তিপুরের মতো ছোট ব্লকেও। যেখানে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল পঞ্চায়েত সমিতিতে গেরুয়া রাশ মজবুত হওয়ার অন্যতম কারণ। আবার রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভায় বিধায়কপন্থী এবং এক নামজাদা মহিলা নেত্রীর গোষ্ঠীর দূরত্ব বারবার প্রকট হয়। যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ এমএলএ কাপ। যদিও উপনির্বাচনে দু’ পক্ষই একসঙ্গে প্রচার করে। ফলস্বরূপ আসন পকেটস্থ করে ফেলে তৃণমূল। সম্প্রতি দলীয় বৈঠকেও দুজনকে পাশাপাশি দেখা গিয়েছে। তবে কি দূরত্ব ঘুচল? কর্মীরা কিন্তু এখনও সিঁদুরে মেঘই দেখছেন। সাংগঠনিক জেলার অন্যতম অভিজ্ঞ মুখ রত্না ঘোষ কর এবং শঙ্কর সিংহ। একসময় তাঁদের হাতেদায়িত্ব দিয়েও সব গোষ্ঠীকে এক করা যায়নি। কুপার্স ক্যাম্পের মতো ছোট জায়গাতেও রয়েছে দু’টি সক্রিয় লবি। একপক্ষ বর্তমান সংগঠনে থাকলে অন্যপক্ষ জেলার অন্যতম সক্রিয় লবিপন্থী।
তবে মন্দের ভালো, বর্তমান জেলা সভাপতি দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়ের অবস্থান। একসময় ছাত্র-যুব রাজনীতির পরিচিত মুখ এবং পরে শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্ব সামলে জেলাস্তরে আচমকা উঠে আসা নেতা তিনি। দলের কর্মীরাই বলছেন, গোষ্ঠী কোন্দল সারিয়ে সংগঠনকে নিরোগ করতে না পারলেও অনেক লবিই দেবাশিসের আবেদনে ক্রমশ কাছাকাছি এসেছে। এটাই এখন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে লড়ার পুঁজি। যদিও প্রকাশ্যে দলের গোষ্ঠীকোন্দল এবং অন্তর্ঘাতের কথা স্বীকার করতে চাননি জেলা সভাপতি। তিনি বলেন, তৃণমূলে কোনও গোষ্ঠীকোন্দল নেই। আমরা সবাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কাজ করি। হয়তো এক সময়ে আমাদের ফলাফল খারাপ হয়েছে। তবে আমরা সেই পরিস্থিতি থেকে উঠে আসবই। বিজেপি হিন্দুত্বের তাস খেলে ভোট আদায় করে। আমরা মানুষের দুয়ারে উন্নয়ন পৌঁছে রানাঘাট সাংগঠনিক জেলার মাটিতে ঘাসফুল ফুটিয়ে দেখাব।