ব্রতীন দাস, জলপাইগুড়ি: কোন পথে আসবে পূর্ণ স্বাধীনতা? ১৯৩৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জলপাইগুড়িতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় কংগ্রেস সম্মেলনে তার সুর বেঁধে দেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। জলপাইগুড়ি টাউন স্টেশনের কাছে পান্ডাপাড়া মাঠে ওই সম্মেলনে প্রধান অতিথি নেতাজি তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেন, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের মধ্যে জাতীয়তা বোধের উন্মেষ, অদূর ভবিষ্যতে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাবে। স্বাধীনতা আন্দোলনে গোর্খাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে ওই সম্মেলনে সুভাষচন্দ্র বসু বলেন, দলবাহাদুর গিরির আত্মত্যাগ, গোর্খা সম্প্রদায়ের মধ্যে জাগরণ ও জলপাইগুড়ি সম্মেলনে তাঁদের অংশগ্রহণ, আমাদের কাছে গৌরবের। তিনি জানিয়ে দেন, বাঙালি সমাজে, বাংলার রাষ্ট্রক্ষেত্রে সাধারণ বাঙালির যে স্থান রয়েছে ও থাকবে, গোর্খাদেরও ঠিক একই স্থান আছে ও ভবিষ্যতেও থাকবে।
জলপাইগুড়িতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় কংগ্রেস সম্মেলন পুরোমাত্রায় সফল হয় বলে দাবি করেছিলেন নেতাজি। বলেছিলেন, ইংরেজ জাতি নিজেদের শক্তি হ্রাস অনুভব করতে পারছে না, আমি মনে করি এটাই তাঁদের পতনের পূর্ব লক্ষণ। সম্মেলনের মঞ্চ থেকে সুভাষচন্দ্র আওয়াজ তোলেন, আজ পরিষ্কারভাবে বলার সময় এসেছে যে, আমরা কোন পথে চলব, কী কৌশল অবলম্বন করব, কীভাবে চললে অদূর ভবিষ্যতে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করতে পারব।
চা বাগান ঘেরা তিস্তাপাড়ের শহরে দাঁড়িয়ে এ ব্যাপারে দিক নির্দেশ করেছিলেন নেতাজি। বলেছিলেন, নিজের শক্তিতে ভর করে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজের সাধনার বলে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করব। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক ঘটনার চাপে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট এক সংকটময় অবস্থায় এসে পৌঁছেছে, তার উপর দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হলে ব্রিটিশদের মাথানত করে ফিরে যেতে হবে। দেশবাসীকে জাগিয়ে তুলতে জলপাইগুড়ির মাটি থেকেই নেতাজি আওয়াজ তুলেছিলেন, ইংরেজ তুমি ভারত ছাড়ো। তাঁর সেই হুঙ্কার কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশকে। ইংরেজদের চরম সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন নেতাজি। বলেছিলেন, ৬ মাসের মধ্যে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে ইংরেজকে।
বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় কংগ্রেস সম্মেলনের মঞ্চ থেকে বার্তা দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র, আমরা যদি সংঘবদ্ধ হয়ে আমাদের দাবি তুলে ধরি, ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের শক্তি নেই যে, আমাদের দাবি উপেক্ষা করে। এই সম্মেলনের মধ্যে দিয়ে জলপাইগুড়ির নাম যেমন ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গিয়েছিল, তেমনই নেতাজির জন্যেও জলপাইগুড়ির এই সম্মেলন ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মেলনের মঞ্চে বসেই সুভাষচন্দ্র খবর পান, ত্রিপুরা কংগ্রেসে ফের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেস ট্রেনে জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছন নেতাজি। ট্রেন থেকে তিনি নামামাত্র কাতারে কাতারে মানুষ ভিড় জমান। স্টেশন থেকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে আসা হয় সুভাষচন্দ্রকে। সম্মেলনে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল সেদিন। সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন শরৎচন্দ্র বসু। জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছনোর পর নেতাজিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল ব্যাপক উন্মাদনা।
নেতাজি সুভাষ ফাউন্ডেশনের সম্পাদক তথা প্রাক্তন বিধায়ক গোবিন্দ রায় বলেন, ১৯২৮ সালেও জলপাইগুড়িতে আসেন নেতাজি। বর্তমানে যেখানে পুরসভার প্রয়াস হল, সেখানে সেসময় ছিল পাওয়ার হাউস। সেটির উদ্বোধন করেন তিনি। দেশের মধ্যে নেতাজির মর্মর মূর্তি প্রথম জলপাইগুড়িতেই বসানো হয়।