অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: নদীর পাড়ে বাস, দুঃখ বারোমাস—উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মঙ্গলকোটের আতকুলা গ্রাম। পাশ দিয়ে বইছে অজয়। ফি বর্ষায় নদীতে জল বাড়ে। প্লাবিত হয়ে পড়ে আতকুলা। দিনের পর দিন ডুবে থাকে ঘরবাড়ি। জলযন্ত্রণা থেকে বাঁচতে বাড়ির উঠোনেই গড়েন অস্থায়ী আস্থানা। আর সেই আস্থানা বলতে বাঁশের মাচা। বর্ষার পুরো মরশুমটাই গ্রামবাসীদের সংসার যাপন সেখানেই। চলে রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া। এমনকী, রাতের ঘুমও। অন্যদিকে, সবার বসত ভিটেতে সংসার পাতে বিষধর সাপেরা। অর্থাৎ, চতুর্দিকে জল। মাচায় মানুষ। নীচে সর্পকূল! স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরও বর্ষাকালে এটাই রোজনামচা আতকুলাবাসীর। এখন চলছে বর্ষার চোখরাঙানি। বাড়ছে অজয়ের জল। গ্রামে শুরু মাচা তৈরির কাজ।
মঙ্গলকোটের অজয়ের কোলে ছোট্ট জনপদ আতকুলা। নদের বাঁধ অত্যন্ত বেহাল। পাড় ভাঙতে ভাঙতে গ্রাম গিলছে অজয়। কিছু অংশে পাড় বলে কিছু নেই। ফলে অজয় সামান্য ফুঁসে উঠলেই হু হু করে জল ঢোকে গ্রামের ভিতর। মুহূর্তেই জলের তলায় চলে যায় ঘরবাড়ি।
দীর্ঘ কুড়ি বছর রাজ্যে বামশাসন দেখেছেন। পালাবদলের পর বদলও দেখছেন গ্রামবাসীরা। ভোট এলে বাঁধ সংস্কারের দাবি ওঠে। রাজনীতির কারবারিদের মুখে শোনেন আশ্বাসের ফুলঝুরি। কিন্তু, নদের পাড়ের গ্রামবাসীদের দুঃখের বারামাস্যা আর কাটে না! অভিযোগ, কোনো সরকারই কথা রাখেনি। না সিপিএম, না তৃণমূল। এবার বিজেপি কি করে, সেটাই দেখার।
আতকুলা গ্রামে ১৭০ থেকে ১৮০টি পরিবারের বাস। মোট ভোটার ৪৮৮। ২০০০ সালের গ্রামের অস্তিত্বটাই উপড়ে ফেলেছিল ভয়াল বন্যা। ২০২১ সালেও করোনা মহামারীর দোসর হয়েছিল সে। বানভাসী হয়েছিলেন গ্রামের মানুষ। সেই থেকে বাঁধের অবস্থা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কোথাও বাঁধের মাটি ধসে বড় খালের রূপ নিয়েছে। কোথাও আবার বাঁধ ক্রমশ সরু ও নিচু হয়ে মিশে গিয়েছে অজয়ের বুকে। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এবারও বর্ষায় অজয়ের জল বাড়লেই গ্রাম ভাসবে। গ্রামের প্রামানিক পাড়া থেকে কোটাল পাড়া পর্যন্ত প্রায় দেড় কিমি বাঁধ বেহাল। সেখান দিয়েই ধেয়ে আসতে পারে জল। গ্রামের বাসিন্দা ননীচুড়া ঘোষ, দিলীপ পালরা বলছিলেন, ‘বর্ষা আমাদের কাছে দুঃস্বপ্ন। প্রতিটি রাত জেগে কাটাতে হয়। নদের বাঁধ বলে কিছু নেই। ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গলে ভরে গিয়েছে। আমরা চাই দ্রুত বোল্ডার দিয়ে বাঁধ বাঁধানো হোক। ক’ বছর আগে বাঁধ মেরামতে মেশিন এসেছিল। কাজ আর হয়নি।’
বাঁধের কাজ হয়নি বলে মাচাই এখন ভরসা গ্রামবাসীদের। বাসন্তী মাঝি, মৃণালকান্তি ঘোষরা বলছিলেন, ‘এবারও বর্ষায় জল ঢোকার আশঙ্কা করছি। তাই, বাঁশের বড় মাচা তৈরি করতে হচ্ছে।’ বাড়ির উঠোনেই বানানো হচ্ছে সেই মাচা। অজয়ের জল ঢোকা শুরু করলেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে উঠে যাবেন সেখানে। মাচার উপর ত্রিপলের ছাউনি। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, বাচ্চাদের পড়াশোনা মাচাই ভরসা।-নিজস্ব চিত্র