নিজস্ব প্রতিনিধি, ভূতনি (মানিকচক): বছরের দু-মাস ত্রাণ শিবিরে কাটে। বাড়িঘরেরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। গঙ্গার গ্রাসে কবে, কার বাড়ি তলিয়ে যাবে, তা বলা মুশকিল। এ অবস্থায় ভূতনিতে মেয়েকে বিয়ে দিতে নারাজ বেশিরভাগ বাবা-মা। যাঁদের বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল, এবারের বন্যা পরিস্থিতি দেখে তাঁরাও পিছিয়ে আসছেন। ফলে বানভাসি ভূতনিতে ভেঙে যাচ্ছে একের পর এক বিয়ে।
বুধবার দক্ষিণ চণ্ডীপুরে পুলিনটোলা ঝড়ু মোড়ে বাঁধের উপর শিবমন্দিরের চাতালে বসে আক্ষেপ করছিলেন মাক্ষ মণ্ডল। বললেন, ছেলে বি এ পাশ। চাকরি না পেয়ে বাবার সঙ্গে মুদি দোকান চালাচ্ছে। প্রায় বছর খানেক ধরে ছেলের বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্রী খুঁজছি। কিন্তু ভূতনিতে থাকি শুনেই পিছিয়ে যাচ্ছে পাত্রীপক্ষ। সাফ জানিয়ে দিচ্ছে, জেনেশুনে মেয়েকে জলে দিতে তো পারি না! ফি বছর যেভাবে বানভাসি হতে হচ্ছে, তাতে পাত্রীপক্ষের এমন বক্তব্য অমূলক নয়।
সামিরুদ্দিনটোলা থেকে নৌকায় ভূতনি ব্রিজের দিকে যাচ্ছিলেন জাহিদুল হক।
বিয়ে ভেঙে যাওয়া নিয়ে কথা উঠতেই বললেন, আমার কাকার ছেলেরই তো বিয়ে ভেঙে গেল। তা নিয়েই তো বাড়িতে সবার মন খারাপ। জাহিদুলের কাছে জানা গেল, তাঁর কাকার ছেলে সামিরুদ্দিনটোলার বাসিন্দা মাইনুল হকের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। পাত্রী মথুরাপুরের শেখপুরা এলাকার বাসিন্দা। ভয়াবহ বন্যার জেরে ভূতনির অবস্থায় শেষ মুহূর্তে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে পাত্রীপক্ষ। জানতে চাওয়ায় বলেছে, ভূতনির যা পরিস্থিতি, তাতে এখানে তারা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে পাঠাতে চায় না।
উত্তর চণ্ডীপুর পঞ্চায়েতে যাওয়ার রাস্তায় বাগদিপাড়ায় দুর্গা মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে কালু দাস বলেন, শুধু বিয়ে ভেঙে যাওয়া নয়, প্রতি বছর বন্যা ও গঙ্গা ভাঙনের জেরে বদলে যাচ্ছে ভূতনির মানচিত্র। কয়েকশো বাড়ি গঙ্গা গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। জল নামলে ভাঙন যে কতটা ভয়াবহ হবে, সেটাই এখন ভাবাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভূতনির বন্যা দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি তুলেছে সিপিএম। এদিন দক্ষিণ চণ্ডীপুর পুলিনটোলায় দাঁড়িয়ে সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য দেবজ্যোতি সিনহা বলেন, প্রতি বছর এভাবে বাঁধ ভাঙবে আর গঙ্গার জল ঢুকে ভূতনি ভাসাবে, এখানকার লক্ষাধিক মানুষের জীবন তছনছ হয়ে যাবে, সংসার-সম্পর্ক সব ভেঙে যাবে, এটা চলতে পারে না। আমাদের দাবি, সরকারি জায়গায় ভূতনির বিপন্ন মানুষজনের জন্য স্থায়ী ঠিকানা করে দিতে হবে। বন্যার জল যাতে ভূতনির কারও জীবিকা কেড়ে নিতে না পারে, বিয়ে ভেঙে দিতে না পারে, অবিলম্বে তার বন্দোবস্ত করতে হবে প্রশাসনকে।