নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: ঘটা করে ঘোষণা হয়েছিল, আবাসের বাড়ি তৈরির জন্য উপভোক্তারা মাত্র দেড় হাজার টাকায় এক ট্রাক্টর বালি পাবেন। খোদ বিধায়ক তথা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের সেই ঘোষণার পর তিলপাড়ায় বালি মজুতও শুরু করেছিল প্রশাসন। কিন্তু কয়েক মাস পেরোতেই সেই পাইলট প্রজেক্ট কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। মজুত করা সেই বালির স্তূপে এখন ঘাস গজাচ্ছে। যে ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের কথায় বালি সরবরাহ করেছিলেন, তাঁদের পকেটে কানাকড়িও ঢোকেনি। বিরোধীদের কটাক্ষ, গোটা বিষয়টাই ছিল স্রেফ রাজনৈতিক চমক ও প্রচারের ফানুস।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন, বালির অভাবে যেন আবাস যোজনার কোনো উপভোক্তার বাড়ি তৈরির কাজ আটকে না থাকে। বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে তাঁদের বালি সরবরাহ করতে হবে। একইসঙ্গে বাজারে বালির জোগান স্বাভাবিক রাখতে, পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্রের অভাবে বন্ধ থাকা বালিঘাটগুলি দ্রুত চালুর নির্দেশ দেন তিনি। কিন্তু খোদ মুখ্যমন্ত্রীর এমন কড়া বার্তার পরেও সিউড়িতে সস্তায় বালি বণ্টনের কাজে বিন্দুমাত্র গতি আসেনি বলেই অভিযোগ। ভূমিদপ্তরের এক আধিকারিকের অবশ্য দাবি, জেলার অন্যান্য বেশ কয়েকটি ব্লকে কিন্তু সস্তায় বালি দেওয়ার কাজ চলছে। দুবরাজপুর, খয়রাশোল, ময়ূরেশ্বর-১ ও ২ সহ একাধিক ব্লকে উপভোক্তারা এই সুবিধা পাচ্ছেন। খয়রাশোলে তো মাত্র এক হাজার টাকায় প্রতি ট্রাক্টর বালি দেওয়া হয়েছে। তাহলে সিউড়ি বা রাজনগরের ক্ষেত্রে এই বেনজির অচলাবস্থা কেন? ব্লক প্রশাসনের এক কর্তার জবাব, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত বালি মজুত রয়েছে। কিন্তু এখনও সেভাবে আবেদন জমা পড়েনি। উপভোক্তারা আবেদন করলেই কম দামে বালি দেওয়া হবে।’ কেন আবেদন জমা পড়েনি? ওই কর্তার দাবি, আমরা দেড় হাজার টাকায় বালি দিলেও পরিবহণ খরচ উপভোক্তার নিজের। সেকারণেই হয়তো কেউ আগ্রহ দেখাননি। যদিও প্রশ্ন, তাহলে অন্যান্য ব্লকে এই প্রকল্প সফল কীভাবে?
প্রশাসনের অন্দরমহল থেকে উঠে আসছে অন্য তথ্য। সূত্রের খবর, উপভোক্তাদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে প্রকট হচ্ছে রাজনৈতিক রং। শাসক শিবিরের নেতারাই নাকি ঠিক করে দিচ্ছেন, কাদের এই কম দামের বালির সুবিধা দেওয়া হবে। সেই ‘রাজনৈতিক আশীর্বাদধন্য’ তালিকা এখনও ব্লক প্রশাসনের টেবিলে এসে পৌঁছায়নি। সেকারণেই তিলপাড়ায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে ওই বালির স্তূপ। নেতা আর প্রশাসনের এই দীর্ঘ টালবাহানায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। প্রশাসন সূত্রের খবর, সিউড়িতে এখনও ৪০ শতাংশ বাড়ি তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়নি। বাড়ি সম্পন্ন না হওয়ার কারণ হিসাবে উপভোক্তারা বালির অগ্নিমূল্যের দিকেই আঙুল তুলছেন। একই অবস্থা মহম্মদবাজারেও। মহম্মদবাজার ব্লকের পোস্ট অফিস মোড় এলাকার বাসিন্দা অনিতা রজক বলেন, এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকায় কি এখনকার দিনে বাড়ি হয়? তার উপর বালির যা আকাশছোঁয়া দাম! কোনোরকমে ধারদেনা করে ছাদ ঢালাই করে ফেলে রেখেছি। ভগবান মুখ তুলে চাইলে আবার কাজ শুরু করব।’
অন্যদিকে, ফাঁদে পড়ে মাথায় হাত বালি কারবারিদেরও। এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘প্রশাসনের কথায় বিশ্বাস করে নিজে কয়েক ডাম্পার বালি তিলপাড়ায় নামিয়েছিলাম। বলা হয়েছিল, বালি বিক্রি হলেই টাকা মিটিয়ে দেওয়া হবে। এখন কবে সেই বালি বিক্রি হবে আর কবে টাকা পাব, তা কেউই বলতে পারছেন না।’ সব মিলিয়ে বীরভূমের বুকে সরকারি ‘সস্তার বালি’এখনও মানুষের নাগালের বাইরে।