আগের রাতে শেষ বাঁশি বাজিয়েছেন সালভাদোরের রেফারি ইভান বার্তোন। তবে ঘোর এখনও রয়েছে। এই প্রতিবেদনের শুরুটা ঠিক কী দিয়ে করা উচিত, বুঝে উঠতে পারছি না। অজেয় ফরাসি দুর্গের পতন? নাকি বিশ্বমঞ্চে তিকি-তাকার জয়? একজন স্প্যানিয়ার্ড হিসাবে অবশ্যই দেশের সাফল্যকে বড়ো করে তুলে ধরব। ইউরোপিয়ান ফুটবল মানেই শুধু গতির বিচ্ছুরণ আর উইং থেকে আক্রমণ তুলে আনা নয়। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া এবং মাথা ঠান্ডা রেখে স্কিল শো করাই সাফল্যের প্রকৃত রহস্য, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল লা রোহা ব্রিগেড। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে অনামী কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্রয়ের পর যাদের নিয়ে গেল গেল রব উঠেছিল, তারাই ফ্রান্সের মতো দলকে রীতিমতো নাকানিচোবানি খাইয়ে বশ মানাল। পাশাপাশি চোখে আঙুল দিয়ে স্পেন বোঝাল, আমরাই সেরা।
মঙ্গলবার খাতায়-কলমে ফেভারিট হিসাবেই মাঠে নামে ফ্রান্স। চলতি বিশ্বকাপে অপ্রতিরোধ্য দেখাচ্ছিল এমবাপে-ডেম্বেলেদের। তাই অতি বড়ো স্পেন অনুরাগীও বুক ঠুকে বলতে পারেনি, সেমি-ফাইনালের লড়াইটা এতটা একপেশে হবে। এর পুরো কৃতিত্বই কোচ লুই ডে লা ফুয়েন্তের। ইউরোপের শেষ দু’টি মেগা আসরে দেশঁ ব্রিগেডকে হারিয়েই ফাইনালে পৌঁছেছিল রড্রিরা। তাই এই ফরাসি দুর্গে ফাটল ধরানোর কৌশল যে তাঁর জানা, তা আগেই বলেছিলেন ফুয়েন্তে। ম্যাচেও তা করে দেখাল ফুটবলাররা। শুরু থেকেই মাঝমাঠের দখল ছিল রড্রিদের কাছে। ফলে ফ্রান্স খেলার তৈরির কোনো জায়গাই পেল না। প্রথম গোলের পুরো দায় লুকাস ডিগনেকে নিতে হবে। বক্সের মধ্যে থেকে ক্লিয়ার করার জন্য ও ভুল দিকে হেড দিল। লুকাসের উচিত ছিল কর্নার করে দেওয়া। কিন্তু সেফ খেলা খেলতে ও শেখেনি। ওঁত পেতে থাকা ইয়ামাল সুযোগ পেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ে। জানত, বলের দখল না পেলেও পেনাল্টি আদায়ের সুযোগ রয়েইছে। আর সেই পাতা ফাঁদে পা দেয় ফ্রান্সের লেফট উইং ব্যাক।
চলতি বিশ্বকাপে মেসি-এমবাপের মতো তারকাও পেনাল্টি মিস করেছে। তবে চাপের মুখে হিমশীতল মস্তিকে স্পটকিক থেকে দারুণ প্লেসিংয়ে বল জালে জড়ায় ওয়ারজাবাল (১-০)। চলতি বিশ্বকাপে এটি তার পঞ্চম লক্ষ্যভেদ। ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে ফ্রান্স লড়াইয়ে ফেরার চেষ্টা চালাল। তবে তা সমতা ফেরানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। এই জায়গায় একটা কথা উল্লেখ করতেই হবে, স্পেনের দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের সঙ্গে উইং-ব্যাকের বোঝাপড়াই এই দলের অন্যতম সম্পদ। এমবাপে-ডেম্বেলেকে কাট করে ঢোকার জায়গায়ই দেয়নি কুকুরেয়া। আর রড্রির জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।
বিরতির পর ডিসেরে ডুয়েকে এনে প্ল্যান বি’র পথে হাঁটেন ফ্রান্স কোচ দেশঁ। প্যারাগুয়ে ম্যাচে তাঁর এই প্ল্যান দারুণ কাজে দিয়েছিল। তবে চলতি টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করা স্পেন ডিফেন্সে ফাটল ধরানোর মতো বারুদ এদিন মজুত করতে ব্যর্থ এমবাপেরা। বরং প্রতিপক্ষের রক্ষণের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ৫৮ মিনিটে ব্যবধান বাড়ায় পেড্রো পোরো (২-০)। এরপর আর ফ্রান্স ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো জায়গা পায়নি। বরং ম্যাচের শেষ পর্বে যেভাবে এমবাপেদের এলেবেলের স্তরে নামিয়ে স্পেন অপদস্থ করল, তা বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে কাঙ্ক্ষিত নয়।
দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফের বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বজয়ের স্বাদ পায় ভিসেন্ত দেল বস্কির ছেলেরা। রবিবার তারই পুনরাবৃত্তির আশায় উত্তাল গোটা দেশ। একজন স্প্যানিয়ার্ড হিসাবেও আমি চাইব, আবার কাপ আসুক স্পেনে।