


শুভজিৎ অধিকারী:ক’দিন ধরেই একটি বিষয় বেশ চক্কর কাটছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শেয়ার, লাইকের বন্যা বইয়ে সেটাকে আরও বেশি করে ঘূর্ণিপাকে ফেলে দিচ্ছে নেট নাগরিকদের বিশেষ একটি অংশ। সন্দেহ নেই, এর পিছনে ওই অংশের সুনির্দিষ্ট একটি সংকীর্ণ উদ্দেশ্য হয়তো কাজ করছে। এবং বিষয়টিকে জোরপূর্বক বিতর্কের ছাঁচে ঢেলে ‘বিতর্কিত’ তকমা দেওয়া হচ্ছে। আর তার জেরেই ট্রোলিং হতে হচ্ছে বাংলার মানবপ্রেমের শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সদর কার্যালয় বেলুড় মঠকে।
সম্প্রতি, প্রথিতযশা বরিষ্ঠ এক সাংবাদিকের কোনো এক সাক্ষাৎকার নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। বিতর্কটি মূলত শ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণের ভাবনায় ইসলাম ধর্ম ও একটি মসজিদের অবস্থানকে ঘিরে। যারা বিতর্ক তৈরি করছে, সত্যিই হয়তো বেলুড় মঠের এমন ধর্মীয় উদারতা যে তার জন্মগত আদর্শ, সেটা জানেই না ওই অংশটি। আর এই অজ্ঞতা থেকেই রে রে করে উঠেছে তারা। একটি ছবি পোস্ট করে রামকৃষ্ণ মিশনের কর্মকাণ্ড নিয়েই যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তাতে অবশ্য বেলুড় মঠের কিচ্ছুটি এসে যায় না।
কিন্তু, প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সেটা হল, রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দকে না বুঝে, তাঁদের আদর্শ, আধ্যাত্মিক দর্শনকে আত্মস্থ না করে বেলুড় মঠের বিরুদ্ধে আঙুল ওঠানোর সাহস পাচ্ছে কোথা থেকে? এরা না বোঝে হিন্দুধর্মের ‘অবতারবাদ’, না বোঝে ‘সনাতনী’র অর্থ। আমাদের প্রাচীন ভারতের সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা বেদ-মন্ত্রে বলে গিয়েছেন, ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’। অর্থাৎ, যাঁকে আমরা ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা বলে মানি, তিনি এক। জ্ঞানীরা তাঁকে বহুনামে অভিহিত করে থাকেন। আর এটাই ভারতের বহুত্ববাদ তত্ত্বের আকর সূত্র। ঋগ্বেদেও অদ্বিতীয় পরম ব্রহ্মের একত্ম নীতিকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। কিন্তু, তিনি বিভিন্ন জাতির দ্বারা বিভিন্ন নামে আরাধিত হয়ে থাকেন। আর অবতারগণ যুগে যুগে অবতীর্ণ হন ধর্মের গ্লানি থেকে বিশ্ব ও মানবতাকে রক্ষা করতে।
আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি। তিনিও ভারতে অবতারগণদের একজন। সমাজে যখন অরাজকতা, অধর্ম, কুসংস্কার এবং চরম মানবিক সংকট দেখা দেয় তখন সমাজ ও মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখাতে, ন্যায়-নীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মহাপুরুষদের আবির্ভাব ঘটে। তাঁদের প্রশ্নাতীত প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব এবং চারিত্রিক গুণাবলির মাধ্যমে ভেঙেচুরে যাওয়া সমাজ নতুন করে পুনগর্ঠিত হয়। মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। বৈষ্ণব আচার্য রামানুজ, রামানন্দ, শ্রীনাথমুনি থেকে শঙ্করাচার্য হয়ে শ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ এমনই এক অন্ধকারময় যুগ সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যাঁরা শুধু বিপথে চলে যাওয়া হিন্দুধর্মকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনেননি, পরমসত্তার নির্দেশে মানবকল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গিয়েছেন। সেই কর্মকাণ্ডেরই সমুজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান আজকের বেলড় মঠ ও মিশন। গুরুদেব শ্রীরামকৃষ্ণের আদর্শ আঁকড়ে ১৮৯৭ সালে যার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন স্বামীজি।
কী ছিল রামকৃষ্ণের সেই আদর্শ কিংবা দর্শন? স্বামীজির কথাতেই শোনা যাক—‘মানবাত্মা বা মানবদেহই একমাত্র উপাস্য ঈশ্বর। অবশ্য অন্য জীবজন্তুরাও ভগবানের মন্দির বটে। কিন্তু মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দির। মন্দিরের মধ্যে তাজমহল।’ তিনি সর্বদা বলতেন, ‘ভারতবর্ষের সকল দুঃখের মূলে বিভেদ। উচ্চশ্রেণি-নিম্নশ্রেণির বিভেদ। ধর্মে-ধর্মে বিভেদ। এই ভেদ নাশ না হইলে কল্যাণের আশা নেই।’ এমন শিক্ষা-দীক্ষা দুই-ই তিনি পেয়েছিলেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের মূর্ত প্রতীক ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছ থেকে। তিনি শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন,‘সকল ধর্মে সত্য আছে। সকল ধর্মই সত্য।’
সেদিন দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে বিশাল মহোৎসব। ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় আয়োজক। উৎসবের শেষে দক্ষিণের বারান্দায় এসে বসলেন ঠাকুর। সামনে ভক্তরা। নরেনও হাজির। তিনি শুরু করলেন ধর্মীয় বিভেদ-বিভাজন নিয়ে আলোচনা। ঠাকুর বলছেন—‘বাড়ির ছাদে নানা উপায়ে উঠা যায়। পাকা সিঁড়ি, কাঠের সিঁড়ি, বাঁকা সিঁড়ি আবার শুধু একটা দড়ি দিয়াও উঠা যায়। তবে, উঠবার সময় একটা কিছু ধরে উঠতে হয়। দু’তিন রকম সিঁড়িতে পা দিলে উঠা যায় না। তবে, ছাদে উঠবার পর সবরকম সিঁড়ি দিয়ে নামা যায়। তাই প্রথমে একটা ধর্মকে আশ্রয় করতে হয়। ঈশ্বরলাভ হলে সেই ব্যক্তি সব ধর্মপথ দিয়ে আনাগোনা করতে পারে। যখন হিন্দুদের ভিতর থাকেন, তখন তাঁকে সকলে মনে করে হিন্দু। যখন মুসলমানদের সঙ্গে মেশে, তখন সকলে মনে করে মুসলমান। আবার যখন খ্রিস্টানদের সঙ্গে মেশে তখন সকলে ভাবে, ইনি বুঝি খ্রিস্টান।’ এবার বলতে শুরু করলেন, ‘একটা পুকুরের চার ঘাট আছে। একঘাটে হিন্দুরা জল খাচ্ছে, তারা বলছে জল। আর একঘাটে মুসলমান, তারা বলছে পানি। আর এক ঘাটে খ্রিস্টান, তারা বলছে ওয়াটার। আবার একঘাটে কতকগুলো লোক বলছে অ্যাকুয়া। তোরা এবার ভেবে দেখ, বস্তুটি কিন্তু এক—জল। তবে, ঝগড়া করবার কি দরকার?’ ঠাকুরের নরেন এহেন ধর্মীয় সহনশীলতার আদর্শকে সামনে রেখেই যে বেলুড় মঠ ও মিশন গড়ে তুলবেন, তাতে আর আশ্চর্যের কি?
আশ্চর্যের যেটা, তা হল আজ যাঁরা মঠ-মসজিদের অবস্থান নিয়ে ভুরু কুঁচকাচ্ছেন, তাঁদের জ্ঞান ভাণ্ডারের দৈন্যতা দেখে। বেলুড় মঠ নির্মাণেই সর্বধর্মকে এক করার বার্তা দিয়েছেন স্বামীজি। স্থাপত্যশৈলীতে তিনি মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন হিন্দু, ইসলামিক, বৌদ্ধিক ও খ্রিস্ট শিল্পকলার। সেই কারণেই আজও মানবসেবার এই মন্দির বিশ্বদরবারে সমাদৃত, প্রশংসিত। সনাতন ধর্মের এই অপার উদারতাকে যাঁরা বিদ্বেষ-বিষে মাখাতে চাইছেন, তাঁরা আর যাইহোক সনাতনী নন।
ঠাকুরের একটা গল্প বলে শেষ করি। ‘বনে এক সাধু ছিলেন। একদিন শিষ্যদের উপদেশ দিলেন, সর্বভূতেই নারায়ণ। তাই সকলকে নমস্কার করবে। একদিন এক শিষ্য হোমের জন্য কাঠ আনতে বনে গেছিল। এমন সময়ে একটা রব উঠল, কে কোথায় আছ পালাও…। একটা পাগলা হাতি যাচ্ছে।’ সবাই পালিয়ে গেল। শিষ্যটি পালাল না! সে জানে, হাতিও নারায়ণ। তবে কেন পালাব? সে দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে মাহুত চেঁচিয়ে বলছে, পালাও, পালাও। শিষ্যটি তবুও নড়ল না। শেষে হাতিটা শুঁড়ে করে তুলে নিয়ে তাকে একধারে ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেল। এই সংবাদ পেয়ে গুরু ও অন্যান্য শিষ্যরা তাকে আশ্রমে ধরাধরি করে নিয়ে গেল। খানিকক্ষণ পরে চেতনা হলে তাকে কেউ জিজ্ঞাসা করলে, ‘তুমি হাতি আসছে শুনেও কেন চলে গেলে না?’ সে বললে, ‘গুরুদেব আমায় বলে দিয়েছিলেন, নারায়ণই মানুষ, জীবজন্তু। তাই আমি হাতি নারায়ণ আসছে দেখে সরে যাই নাই।’ গুরু তখন বললেন, ‘বাবা, হাতি নারায়ণ আসছিলেন বটে, তা সত্য। কিন্তু মাহুত নারায়ণ তো তোমায় বারণ করেছিলেন। যদি সবই নারায়ণ, তবে তার কথা বিশ্বাস করলে না কেন? মাহুত নারায়ণের কথাও শুনতে হয়। এই জগৎসংসারে সাধু, অসাধু, ভক্ত, অভক্ত—সকলেরই হৃদয়ে নারায়ণ আছেন। কিন্তু অসাধু, অভক্ত, দুষ্ট লোকের সঙ্গে ব্যবহার চলে না। মাখামাখি চলে না। কারও সঙ্গে কেবল মুখের আলাপ পর্যন্ত চলে। আবার কারও সঙ্গে তাও চলে না। ওইরূপ লোকের কাছ থেকে তফাতে থাকতে হয়।’
ঠাকুর রামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয়ের দর্শনকে যাঁরা অগ্রাহ্য করছেন, তাঁদের সঙ্গে তফাতেই থাকা শ্রেষ্ঠ পন্থা।