নিজস্ব প্রতিনিধি: বাংলার নির্বাচনে এবার ‘হট টপিক’ হয়ে উঠেছিল কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ি। কোথাও বড়ো ধরনের অশান্তি ঘটলে বা উপদ্রুত এলাকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে এই ধরনের গাড়ির টহল দেখা যায়। ভোটের বাংলায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে তেমনই অজস্র সাঁজোয়া গাড়ি মোতায়েন করেছিল নির্বাচন কমিশন। ভোটের ক’দিন আগে থেকে শহর-শহরতলি-গ্রামাঞ্চলে সাঁজোয়া গাড়ির টহল দেখা গিয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে আম জনতার বড়ো অংশের বক্তব্য, ভয় ভাঙানোর জন্য আনা সাঁজোয়া গাড়িই তো ভোটারদের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে! ভোট নাকি যুদ্ধ—এই প্রশ্নও জোরদার হয়েছে মানুষের মধ্যে।
বুধবার দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটে দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ টাকি রোড ধরে সাঁজোয়া গাড়ি পৌঁছায় দেগঙ্গায়। সেই গাড়িতে সাত-আটজন জওয়ান ছিলেন। গাড়ির মধ্যে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে ছিলেন এক জওয়ান। পিছনে আরও দু’টি গাড়িতেও বাহিনীর জওয়ানরা ছিলেন। জীবনপুর বাজারে তখন কয়েকজন জটলা করছিল। নজরে আসতেই সাঁজোয়া গাড়ি থেকে নেমে জওয়ানরা লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যান। গ্রামের সিংহভাগ লোকজন এমন সাঁজোয়া গাড়ি কখনও দেখেননি। ফলে সেই গাড়ি ঢুকতেই বহু উৎসুক বাসিন্দা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়েন। কিন্তু জওয়ানদের মারমুখী মেজাজ দেখে ঘাবড়ে গিয়ে ছুট দিয়েছেন তাঁরা। দেগঙ্গার চাঁদপুর, আমুলিয়া, কোলাপোল হয়ে অশোকনগরের গুমা থেকে হাবড়া বিধানসভার বিভিন্ন বুথের সামনে দিনভর চক্কর খেয়েছে সাঁজোয়া গাড়ি।
ভোটারদের অবশ্য দাবি, শান্তিপূর্ণ ভোটের আবহে বাহিনীর এই ‘রণসাজ’ই আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে। কোলাপোলের বাসিন্দা সুরজ আলি, জীবনপুর বাজারের বাসিন্দা ফারুক হাওলাদার বলেন, ‘দেগঙ্গায় এবার ভোট শান্তিতেই হয়েছে। কিন্তু গ্রামে গ্রামে ওই সাঁজোয়া গাড়ি ঘোরায় ভোটারদের মধ্যে ভয়ের একটা পরিবেশ তৈরি হয়।’ নদীয়ার সগুনা এলাকায় বাহিনীর এই সক্রিয়তা দেখে গ্রামবাসীদের প্রশ্ন, ‘মণিপুরে না গিয়ে এখানে শান্ত এলাকায় এসব গাড়ির কী কাজ!’ তার আগে সগুনা পঞ্চায়েতের ৬৫ ও ৬৬ নম্বর বুথের ২০০ মিটারের বাইরে থাকা তৃণমূলের ক্যাম্পও ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে।
সাঁজোয়া গাড়ি ‘মার্কসম্যান’-এর টহলদারি নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে ভাটপাড়া, জগদ্দলেও। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে নাকি? সকাল থেকেই ভাটপাড়া, জগদ্দলে খোলা জিপের ওপরে মেশিনগান লাগিয়ে সিআরপিএফ জওয়ানদের ঘুরতে দেখা যায়। অতীতের কোনো ভোটে এত নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন ছিল না বারাকপুর শিল্পাঞ্চলে। বিশেষ করে ভাটপাড়ায় এদিন দু’পা হাঁটলেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানের দেখা মিলেছে। হুগলির ব্যান্ডেলে সাঁজোয়া গাড়ির টহলদারি ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামীণ এলাকাতেও ওই গাড়ি টহল দেয়। চুঁচুড়ার কাপাসডাঙার বাসিন্দা এক বৃদ্ধা ভোট দিতে এস বলেই দিলেন, ‘এসব গাড়ি দেখেই তো ভয় লাগছে।’ এই অবস্থায় রাজনৈতিক মহল মনে করছে, সাঁজোয়া গাড়ি আনার পিছনে কমিশনের যে উদ্দেশ্য ছিল, সেটাই কার্যত ব্যুমেরাং হয়েছে।