


আর জি কর আন্দোলনের সময় যারা ওই সরকারি হাসপাতালের প্রাত্যহিক চিকিৎসা পরিষেবা বন্ধ করে রেখে বিক্ষোভ, অবস্থান, সমাবেশের বিরোধিতা করেনি, তারাই এখন গ্রামের মানুষের কাছে ভোট চাইছে। সেই সময় এই অংশটি প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় বলতেই পারত যে, জাস্টিসের দাবিতে যে আন্দোলন চলছে সেটা অবশ্যই চলুক। কিন্তু কোনোভাবেই সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া আমরা সমর্থন করি না। বলেনি। কারণ তারা ভেবেছিল সরকার বিপদে পড়েছে। সুতরাং বেশ হয়েছে। সরকার বিপদে পড়েনি। পড়েছিল গ্রাম শহরের গরিব মানুষ। যারা বেসরকারি নার্সিংহোমে চিকিৎসা করতে পারে না। সেই ক্ষমতা নেই। দিনের পর দিন দেখা গিয়েছিল গ্রাম, মফস্সল, কলকাতার গরিব শ্রমজীবী মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গিয়েছে। মৃত্যু হয়েছে একাধিক রোগীর। কিন্তু সেই সময় এসব নিয়ে ভাবার সময় হয়নি। তখন মনে হয়নি যে, এরাও কিন্তু ভোটার। এরা সব মনে রাখবে। এখন ভোট এসেছে। গ্রাম মফস্সলে সেই মানুষগুলির কাছে সেইসব দল ও তাদের সমর্থকরা কিন্তু ভোট চাইছে, যারা নাকাল হয়েছিল দিনের পর দিন চিকিৎসা করাতে গিয়ে।
প্রত্যেকটি ভোটের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর একটি শ্রেণি প্রকাশ্যে বলে থাকে, বাঙালির মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছে। এরা ভিখারির জাত। নানারকম সরকারি ভাতার ভিক্ষা পেয়ে পেয়ে এদের আর আত্মসম্মান নেই। তাই প্রকৃত ইস্যুতে ভোট দেয় না। এরা হল ভাতাজীবী ভিক্ষুক। যারা এরকম বলে থাকে, তারা কিন্তু আবার পরের ভোটে সেই ভাতাজীবী ভিক্ষুকদের পাড়ায় পাড়ায় যায় এবং ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। অর্থাৎ এরা ভাবে যে, যাদের বিগত ভোটে ভিখারি বলেছে, তারা সেই অপমান ভুলে গিয়ে ভোট দেবে। এবার ভোটে হেরে গেলে, আবার বলবে ভাতাজীবী ভিক্ষুক। ভাতার রাজনীতি কি সমর্থনযোগ্য? একবারেই নয়। কিন্তু এই সোশ্যাল সিকিউরিটি বিশ্বজুড়ে চলছে। সব রাজ্যে দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমি দেশগুলিতেও চলছে। তাই এই ভাতা দেওয়ার রাজনীতিকেই শুধু আক্রমণ করার রাজনীতি ভুল। বিরোধীদের বুঝতে হবে যারা সরকারে থাকে, তাদের এটা বাড়তি শক্তি। অর্থাৎ ভাতা দেওয়ার সুবিধা পাবে শাসক দল, এটা ধরে নিয়েই বিরোধীদের লড়াই করতে হবে। আবিষ্কার করতে হবে যে, তাহলে কোন কোন ইস্যুতে কোণঠাসা করা যায় শাসককে।
অথচ গ্রাম মফস্সল এবং এই আর্থিক সাহায্য নেওয়া অংশকে বিরোধীরা অযথা অপমান করে তাদের বিরক্তি উৎপাদন করার রাজনীতি করেছে। যা আদতে সাহায্য করেছে শাসক দলকে।
ভোটের অঙ্কের সমীকরণ কী? সমীকরণ হল, আমার কাছে যে ভোট ব্যাংক আছে, সেই ভোটব্যাংক যদি দেখা যায় বছরের পর বছর ধরে আমাকে জয়ী করতে পারছে না, তাহলে আরও অতিরিক্ত ভোট দরকার। কোথা থেকে আসবে সেই অতিরিক্ত ভোট? আমার বিপক্ষের ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরাতে হবে। ২০১১ সালে বামভোট, বিজেপির ভোটের একাংশ পেয়ে তৃণমূল গরিষ্ঠতা পায়। সঙ্গে কংগ্রেসের ভোটব্যাংক তো ছিলই। বিপক্ষের ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরাতে না পারলে স্থিতাবস্থা চললে ভোটে জয় আসে না। তাহলে সেই ভোটারদের অপমান করলে কাজ হবে? নাকি তাদের কাছে গিয়ে আরও ভালো ব্যবহার করে কাছে টানার প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে? কিন্তু সেটা কি হচ্ছে? হচ্ছে না।
তৃণমূলের সমর্থক অথবা ভোটার হলেই তাকে যদি ‘চটিচাটা’, ‘চোরেদের সমর্থক’ বলে অপমান করা হয়, তাহলে সেই ভোটার কি আর কখনো শত বিরূপতা সত্ত্বেও এই অপমানকারীদের দলকে ভোট দেবে? দেবে না। এটা কোনো রকেট সায়েন্স নয়। রাজনীতির সহজপাঠ। রাজনীতির সহজ রসায়নের মধ্যে আর কী কী পরিসংখ্যান আছে?
প্রথম থিওরি হল, তৃণমূলের জয়কে মুসলমানের ভোটব্যাংক হিসেবে তকমা দেওয়া। এই রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতার তুলনা হয় না। তৃণমূলের কাছে শেষতম নির্বাচনে ভোটশেয়ার ছিল ৪৬.৫ শতাংশ। মুসলমান জনসংখ্যা কত? কমবেশি ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ। তৃণমূলের ওই বাড়তি ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ ভোট তাহলে কোথা থেকে আসছে? তাও আবার সব মুসলমান তো আর তৃণমূলকে দিচ্ছে না ভোট। তাহলে ওই যে মুসলমান ছাড়াও ওই অতিরিক্ত ভোট, সেই ভোট কমছে না কেন? কমছে না, তার কারণ একাধিক। প্রথমত, হিন্দু ও মুসলিম মিলিয়ে বাংলার ভোটারদের একটি বড়ো অংশ আছে যারা দাঙ্গা, বিভাজন, ভিনদেশি সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার বিচার নিয়ে উগ্র প্রচার অথবা জীবনযাপন এসব পছন্দ করে না। এই অংশটি হল ট্র্যাডিশনাল শিক্ষিত বাঙালি সেকুলার টাইপ। এরা বিজেপির নেতাকর্মীদের কথাবার্তা, দিল্লি থেকে বাংলাকে পরিচালনা করার প্রবণতা এসব অপছন্দ করে। এরা যে তৃণমূল অন্ত প্রাণ এমন নয়। কিন্তু নিজেদের প্রগতিশীল ভাবতে ও রাখতে পছন্দ করে এরা। আর তাই বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূল। এই অংশে বিজেপি কি ভাঙন ধরানোর কোনো চেষ্টা করেছে?
দ্বিতীয়ত, মহিলা ভোট। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটেও মহিলা ভোট হবে নির্ণায়ক শক্তি। ভারতে মহিলা ভোটারদের প্রদত্ত ভোটের হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ১৯৬২ সালে পুরুষদের মধ্যে গড়ে ৬৩ শতাংশ ভোট দিয়েছিল বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা ভোটগুলিতে। মহিলাদের মধ্যে ভোটের হার ছিল ৪৩ শতাংশ। ২০১৮ সালে এই হারের যে বদল ঘটেছে সেটা অবিশ্বাস্য। পুরুষদের মধ্যে ভোটের হার হয়েছে ৬৯ শতাংশ। মাত্র ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর মহিলাদের মধ্যে ২০১৮ সালের বিধানসভা ভোটগুলিতে ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ ভারতে মহিলারা আরও বেশি বেশি করে ভোট দিতে শুরু করেছে।
মহিলাদের মধ্যে শুধুই কি ভোট দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে? অত্যাশ্চার্য সমীক্ষা রিপোর্ট করেছে লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজ। তারা রিপোর্টে বলেছে, ভারতের মহিলাদের বিগত ১০০ বছরে শারীরিক উচ্চতা (হাইট) গড়ে ৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। পুরুষদের বৃদ্ধিহার ৩ সেন্টিমিটার।
মহিলাদের ভোটিং প্যাটার্ন সাধারণত কারা কী দিচ্ছে সেটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ভারতে। সেই কারণে একটি সরকার যদি মহিলাদের লাগাতার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ সাহায্য অথবা অন্য সামাজিক সিকিউরিটি দিতেই থাকে, তাহলে মহিলারা সেই সরকারকে রেখে দিতে চায়। নবীন পট্টনায়ক থেকে নীতীশকুমার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি (উজ্জ্বলা গ্যাস) এই সুবিধা পেয়েছেন। কারণ কী? সামাজিক সমীক্ষকদের বক্তব্য, মহিলাদের মধ্যে নিশ্চিন্তি তৈরি হয় যে, এই সরকারের আমলে আমরা এই এই সুবিধা পাচ্ছি। আবার বদলে গেলে কী হবে কে জানে! আর পাচ্ছিই যখন, তখন দেব না কেন ভোট! এই মনোভাব কাজ করে। বিহারে নরেন্দ্র মোদির এত ম্যাজিক কিংবা ক্যারিশমা অথবা ডবল ইঞ্জিনে লাভ হয়নি। ভোটের আগে মহিলাদের তাই ১০ হাজার টাকা সরাসরি দিতে হয়েছে নীতীশকুমারকে। বাংলায় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সবথেকে বড়ো ভুল হল, ১১ বছরে যারা সরাসরি কোনো সহায়তা, উন্নয়ন প্রকল্প বাংলাকে দেয়নি। বাজেট এসেছে, বাজেট গিয়েছে। কিন্তু একেবারে সাধারণ গরিব খেটে খাওয়া পরিবারের উপকার হচ্ছে সংসারে, এরকম কিছুই দেয়নি মোদি সরকার। এম স্কোয়ার। অর্থাৎ মুসলিম ও মহিলা ভোটব্যাংক এবারও অনেকটাই অ্যাডভান্টেজ হয়ে রয়েছে তৃণমূলের জন্য। কারণ, এই ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরানোর মতো কোনো মেথডিক্যাল রাজনীতি দেখা যায়নি বিজেপির মধ্যে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যয় এসআইআরকে ধরে ফেলেছেন। তাঁর এই রাজনীতি যদি বিজেপির মতুয়া ভোটে নগণ্যতম হারেও ভাঙন ধরায়, তাহলেই তৃণমূলের বিরাট লাভ হয়ে যাবে ভোটশেয়ারে। বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব অনেক আগেই হস্তক্ষেপ করে এসআইআর যদি এবার আপাতত স্থগিত করে দিতে পারত, তাহলে এসআইআর ইস্যু আর কাজ করত না। কিন্তু এখন এই যে বৈধ নাগরিককে আইডেন্টিটিহীন, বিচারাধীন, অনাগরিক তকমা, সংশয় এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝঞ্ঝাটের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল, এটাই বিজেপির জন্য বাড়তি সংকট নিয়ে এসেছে।
বিজেপি প্রায় ইস্যুহীন রাজনীতি করছে বাংলায়। সেভাবে জয় পাওয়া সমস্যা। বিক্ষিপ্তভাবে অনেক ইস্যুতে কাজ হয় না। একটি কোনো জ্বলন্ত ইস্যুকে অন্তত ভোটের চালিকাশক্তি করতে হয়। বিজেপি ইস্যু ছাড়াই লড়াইয়ের ময়দানে। ইস্যু কাকে বলে? যা নিয়ে পথেঘাটে, বাসে ট্রেনে, অফিস আদালতে আলোচনা হয়। এখন রাজ্যে সবথেকে কোন বিষয়ে আলোচনা হয়? এসআইআর। তাহলে কার লাভ কার ক্ষতি?