স্বাধীন ভারতে জনগণের হিতার্থের কথা বলে নানা সময় বাণী বিতরণ করে এসেছেন রাষ্ট্রনায়করা। নরেন্দ্র মোদিই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন! অতএব ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই তিনি ঘোষণা করেন, না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর এই জেহাদের রেশ মেলাতে না মেলাতেই জাতির উদ্দেশে তাঁর পরের বাণীটি ছিল, ‘আমরা যদি বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে ভারতের গণতন্ত্র টিকবে না।’ কিন্তু তার পরের এগারো বছরে মোদি জমানার সারসত্যটা হল, দুর্নীতির সূচকে ২০২৫-এ বিশ্বের ১৮২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান হয়েছে ৯১তম। আর গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিশ্বের ১৮০টি দেশের তালিকায় ভারত রয়েছে ১৫১তম স্থানে। যা দেখে-শুনে বলাই যায়, মোদির শাসনকালে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা স্থূল রশিকতায় পরিণত হয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার গলা টিপে ধরা হয়েছে অবশ্য পাঁচ দশক আগে ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময়। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ‘আসল’ অর্থ সেদিন দেশবাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সরকারি তথ্য বলছে, ১৯৭৬ সালের মে মাসে প্রায় ৭০০০ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেই অভিশপ্ত অধ্যায়ের অবশ্য যবনিকা পড়ে ১৯৭৭ সালে। মোদি জমানায় গত এগারো বছর ধরে গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধ সমাধা হয়েছে। সরকারি কিংবা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মুখ খুললেই ইডি-সিবিআই, রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা, এমনকি খুনও হয়ে যেতে হচ্ছে! গণতন্ত্রের স্বাধীনতার এই হাড়হিম করা ছবি উঠে এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা রিপোর্টে।
রিপোটার্স উইদাউট বর্ডারস নামক প্যারিসস্থিত আন্তর্জাতিক সংস্থাটি বছর বছর যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তা দেখলে অমিত শাহের সেই অমোঘ বাণীর কথা মনে পড়ছে, ‘ক্রোনোলজি সামঝাইয়ে’। এই ক্রোনোলজি বলছে, বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ২০১৬ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ছিল ১৩৩। পাঁচ বছর পর ২০২১-এ তা আরও নিম্নগামী হয়ে ১৪২, ২০২২-এ ১৫০তম স্থানে চলে যায়। ২০২৩ সালে তা আরও নেমে পৌঁছায় ১৬১ তে, ২০২৪-এ ১৫৯তম স্থানে। ২০২৫ সালে অবশ্য কয়েক ধাপ উপরে উঠে ভারতের স্থান হয়েছে ১৫১ তে। শেষবার পড়শি নেপাল (৯০তম), মালদ্বীপ (১০৪তম), শ্রীলঙ্কা (১৩৯তম) এবং বাংলাদেশও (১৪৯তম) ভারতের থেকে এগিয়ে রয়েছে। এই সমীক্ষা রিপোর্টের পর্যবেক্ষণ হল, ২০২৪ থেকে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে এক ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’র মধ্যে পড়তে হয়েছে। মোদি ঘনিষ্ঠ দুই শিল্পগোষ্ঠী এখন এই বিশাল মিডিয়া সাম্রাজ্যের অধীশ্বর। একটি শিল্প গোষ্ঠীরই রয়েছে ৭০টির বেশি মিডিয়া। আবার ২০২২-এ আর একটি শিল্পগোষ্ঠী মিডিয়া বহুত্ববাদের অবসান ঘটিয়েছে। ভারতে উত্থান ঘটেছে ‘গদি মিডিয়ার’। এ হল মুদ্রার এক পিঠ। মোদি জমানায় সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার অন্য পিঠের ভয়াবহ ছবি উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার সমীক্ষা রিপোর্টে। তাতে ভারতকে দুর্নীতির খবর করতে যাওয়া সাংবাদিকদের জন্য ‘বিপজ্জনক দেশ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সূচকে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪২তম। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ৮২৯ জন সাংবাদিক খবর করতে গিয়ে মারা গিয়েছেন। খুনের ৯০ শতাংশের বেশি ঘটনা ঘটেছে সেইসব দেশে যাদের দুর্নীতি সূচকে নম্বর ১০০-র মধ্যে ৫০-এর কম। এই তালিকায় অন্যতম নাম ভারত। এ দেশের নম্বর ৩৯। ভারতে খুন হওয়া সাংবাদিকদের সংখ্যা ৩০-এর কাছাকাছি। এঁদেরই একজন হলেন গৌরী লঙ্কেশ।
রীতিমতো চাবুকের সামনে মিডিয়াকে রেখেও পুরোপুরি সফল হওয়া যাচ্ছে না দেখে এবার সরকারি অফিসারদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। বলা হয়েছে, কোনোরকম গোপন বা সংবেদনশীল তথ্য মিডিয়াকে জানানো যাবে না। সরকারের দাবি, সাম্প্রতিককালে দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে বা সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে— এমন তথ্য ফাঁসের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এই হুঁশিয়ারি। এমনটা ঘটলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের অফিসিয়াল সিক্রেসি আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনা হল, গত এগারো বছরের প্রধানমন্ত্রী মোদি সেভাবে কোনো সাংবাদিক বৈঠক করেননি। উলটে মত প্রকাশের স্বাধীনতা তথা সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে যাবতীয় দমনপীড়ন মূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করে চলেছে তাঁর সরকার। এবার সরকারি তথ্য গোপন রাখার স্বার্থে অফিসারদের সতর্ক করে তথ্য জানার অধিকারেরও দরজা বন্ধ করতে চাইছে কেন্দ্র। স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন জেগেছে কী আড়াল করা চেষ্টা হচ্ছে? কীসের এত লুকোচাপা? কিন্তু এত কিছু করেও কি সংবাদ মাধ্যমকে আটকানো যাবে?