বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়, বজবজ: আধুনিকতার চাকচিক্য আর আলোর ঝলকানি নেই। বরং এর ঠিক বিপরীত স্রোতে পা রেখে শুদ্ধাচারে নিয়মনিষ্ঠা মেনে ও শুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণে চণ্ডীপাঠ, সন্ন্যাসীদের নিয়ে বিশাল যজ্ঞ, ভোগ দেওয়ার রীতি এখনও বহমান। এছাড়াও কীর্তন, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা আছে। ভক্তি সহকারে শতবর্ষ পার করল মহেশতলার নাথপাড়ার শ্রী শ্রী আত্মানন্দ স্মৃতি মন্দির মাঠঘর বারোয়ারি।
পুজো কমিটির কর্মকর্তা হারাণ নাথ বলেন, ‘দূরদূরান্ত থেকে শয়ে শয়ে ভক্তপ্রাণ মানুষ এই পুজো দেখার পাশাপাশি মন্ত্রোচারণ শুনতে প্রতিদিন ভিড় করেন। অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়ার ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। ভিড়ের প্লাবন হয় সপ্তমী ভোরে। শতবর্ষ প্রাচীন এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ ‘কলা বউ’ স্নান। শাস্ত্রমতে যা নবপত্রিকা নামে পরিচিত। তা এত ঘটা করে ও শ্রদ্ধা সহকারে হয় যে, গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্য কোনো বারোয়ারিতে দেখা যায় না। আসলে এর পিছনে কারণ আছে। তা হল, প্রকৃতি হল মায়ের জীবন্ত মোহময়ী রূপ। সেই প্রকৃতির ন’টি উদ্ভিদ যথা কলা, কচু, হরিদ্রা, বা হলুদ, জয়ন্তী, বেল, দাড়িম্বা বা ডালিম, অশোক, মানকচু, ও ধানকে একত্রে বেঁধে দুর্গা তথা কলা বউয়ের জীবন্ত রূপ দেওয়া হয়। সপ্তমীর ভোরে কয়েক হাজার মানুষ, মঠের সন্ন্যাসীরা কাঁসর ঘণ্টা, শঙ্খ, উলুধ্বনি, ঢাক, মাদল ও আরও বাদ্যযন্ত্র সহকারে কলা বউকে নিয়ে শোভাযাত্রায় বের হন। নিয়ে যান গঙ্গায়। সেখানে লাল পাড়, সাদা শাড়ি পরিয়ে নববধূর রূপ দেওয়া হয়। ঘাটে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ ও আরতির মধ্যে দিয়ে নববধূ বরণ ও কপালে সিঁদুর পরানোর রীতি। এরপর শোভাযাত্রা সহকারে মর্যাদার সঙ্গে কলা বউকে এনে মণ্ডপে গণেশের ডানদিকে স্থাপন করা হয়। এরপর মাটির তৈরি সাবেকি দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও সূচনা হয় সপ্তমী পুজোর। এখানকার মানুষের বিশ্বাস, ওই দিন কলা বউ স্নান ও তাঁকে দর্শন করে সে জল মাথায় দিলে অমঙ্গল কাটে। তাই সেদিন দীর্ঘ লাইন পড়ে। বাটানগর ও আক্রার মাঝে নাথপাড়ায় প্রায় একশো পাঁচ বছর আগে স্বামী আত্মানন্দ মহারাজ ও সন্ন্যাসীদের হাত ধরে দুর্গাকে এই মন্দিরে বরণ করে নিয়ে আসা হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে পরাধীন মানুষের ভিতর সবসময় ইংরেজদের নিয়ে ভয় থাকত। সেই পরিস্থিতিতে ভয় দূর করে মানুষের আত্মিক বিকাশে শ্রী শ্রী আত্মানন্দ মহারাজ শুরু করেন জগজ্জননীর পুজো।