সংবাদদাতা, জঙ্গিপুর: উঠোনজুড়ে চাপ চাপ রক্ত। ছিটকে পড়ে রয়েছে চার শিশুর হাতের আঙুল! ছিঁড়ে নেওয়া চুলের গোছা। তার মধ্যেই পড়ে নিথর তরতাজা তিনটি প্রাণ! নানা নেশায় আসক্ত বিকারগ্রস্ত এক যুবকের এহেন বর্বরোচিত হত্যালীলায় বৃহস্পতিবার বিকেলে কেঁপে গিয়েছিল মুর্শিদাবাদের সূতি থানার রঘুনাথপুর। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার পরও স্বাভাবিক হতে পারেননি এলাকাবাসী। চারিদিকে থমথমে পরিবেশ। নিহত শিশুদের বাড়িতে বুকফাটা আর্তনাদে বাতাস ভারী। গ্রামজুড়ে দাবি উঠছে অভিযুক্তের ফাঁসির।
গতকালই গোলাম সারওয়ার ওরফে বাদশা নামে ওই বিকারগ্রস্ত যুবকের হামলায় ঘটনাস্থলেই মারা যায় মনিফা খাতুন (৪), আনিসা খাতুন (১০) ও ইসরাত জাহান (১২)। গুরুতর জখম অবস্থায় মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন শিশুকন্যা নুসরত জাহান। তার অবস্থা সংকটজনক বলে এদিন হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। নিহত ও জখম শিশুরা বাদশারাই ভাইঝি ও ভাগনি। শুক্রবার বাদশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতে তোলা হয়। সাতদিনের হেপাজত চেয়ে আবেদন করেছিল পুলিশ। বিচারক পাঁচদিনের হেপাজত মঞ্জুর করেছেন।
কেন বাদশা এমন হাড়হিম হত্যাকাণ্ড ঘটাল? পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বিভিন্ন নেশায় আসক্ত ছিল বাদশা। মাঝেমধ্যে মানসিক সমস্যার ওষুধ খেত। তার ঘর থেকে বহু ওষুধপত্রও উদ্ধার হয়েছে। তবে, ঘটনার ঠিক মুহূর্তে সে কি সত্যিই মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল, নাকি এই নৃশংস হত্যালীলার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র—তা নিয়েই ধন্দ বাড়ছে। ঘটনার সময় এক বৃদ্ধা আত্মীয়া বলছিলেন, ‘চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে আসি। দেখি মাটির উপর আঙুল কাটা অবস্থায় ছটফট করছে শিশুগুলি। চারপাশ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আশেপাশে কেউ ছিল না। ’
মৃত মনিফা খাতুনের মা ইসমোতারা খাতুন বলেন, ‘মেয়ে খেলতে গিয়েছিল দু-মিনিটও হয়নি। আমার মেয়েটার গলা নামিয়ে দিয়েছে। ওর ফাঁসি চাই। এতোগুলো প্রাণ কেড়ে নিল! ওকে আর দেখতে চাই না। ওদের সবাইকে গ্রামছাড়া করা হোক।’ পুলিশ সূত্রের খবর, তদন্তকারীরা ধৃতের চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখছেন। একইসঙ্গে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন খুদের শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখা হচ্ছে। এক পুলিশকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে মানসিক সমস্যার কথা বলা হলেও তদন্তে সবদিকই খোলা রাখা হচ্ছে। এদিকে একই পরিবারের তিন শিশুর এমন অকাল মৃত্যুতে শোক ও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সূতির বাসিন্দারা। চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ সবার। এদিনও নিহত শিশুদের বাড়িতে পড়শিদের ভিড় ছিল। পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা জানানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না কেউই। সবাই একবাক্যে বলছেন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসাবে অভিযুক্ত যুবকের ফাঁসিই চাই।