মুখোমুখি আড্ডায় ‘জিঙ্গল কুইন’ বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী শ্রাবন্তী মজুমদার।
মুখোমুখি আড্ডায় ‘জিঙ্গল কুইন’ বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী শ্রাবন্তী মজুমদার।
বয়সে কী আসে যায়! সাজিয়ে রাখা সোফায় ঋজু শরীরে শিরদাঁড়া সোজা রেখে শ্রাবন্তী মজুমদার যখন বলেন, ‘আমার তারুণ্য তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না’, তখন মনে হয়, সত্যিই তো বয়স একটা সংখ্যা মাত্র। সত্তরোর্ধ জাদুকণ্ঠী মাঝেমধ্যে হাজির হন কলকাতায়। কিছুদিন আগে এসেছিলেন তিনটি গানের ডালি নিয়ে।
শুরুর গল্প
পঁয়তাল্লিশ স্পিডের ইপি রেকর্ড থেকে ডিস্ক। প্রযুক্তির এই দীর্ঘ পরিক্রমায় শ্রাবন্তীর শুরু সেই সত্তরে। সঙ্গীত সমাজের একাংশের উপেক্ষা, অবজ্ঞার অভিমানে ১৯৯৫ সালে কলকাতা ছেড়ে ইংল্যান্ডের দ্বীপ রাষ্ট্র আইল অব ম্যান-এ পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন। ‘পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। কিন্তু আমার জগতের মানুষ আমাকে কিছু দেয়নি। তাতে আমার কিছু এসে যায়নি বলে আজও আমি দাঁড়িয়ে আছি’, স্পষ্ট বললেন শ্রাবন্তী।
গানের গল্প
গান শোনার শিক্ষা শৈশব থেকেই। ‘লুকিয়ে গান শুনতাম। লুই আর্মস্ট্রংয়ের হোয়াট আ ওয়ান্ডার ফুল ওয়ার্ল্ড শোনা অনেকটা সেই ভাবে। তা আজও প্রাসঙ্গিক। মনে হয়েছিল লুই আর্মস্ট্রংয়ের ওই গানটা আমার মতো করে তৈরি করলে কেমন হয়? ‘কী সুন্দর এই পৃথিবী’ গানটা আমার আজীবন লালন করা ভাবনার ফসল’, বললেন শিল্পী। দ্বিতীয়টি, দেশ কালের সীমা অতিক্রম করা জেলেদের গান। তৃতীয়টি ‘দাদু, নাতি আর মাছের গান’। তাঁর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে রয়েছে গানগুলি।
গলার গল্প
একদা বিবিধ ভারতীর অনুষ্ঠানগুলিতে বাঙালির শ্রুতিকে আচ্ছন্ন করে রাখত যে কণ্ঠস্বর, শিল্পীর বার্ধক্যেও তাতে টোল পড়েনি এতটুকুও। কোন রহস্যে? ‘এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে সন্ধ্যাদি (মুখোপাধ্যায়) বলেছিলেন, যেখানেই যাও না কেন, রেওয়াজটা বজায় রাখবে। এখনও আমি রোজ রেওয়াজ করি’, শ্রাবন্তীর স্বরে আত্মবিশ্বাস।
আক্ষেপের গল্প
শ্রাবন্তীর প্রথম গান রেকর্ড হয়েছিল ১৯৭০-এ। ‘আমি একটা ছোট্ট বাগান করেছি’। কথা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সুর ভি বালসারার। তারপর বহু গান তাঁর কণ্ঠে ভালোবেসেছেন শ্রোতারা। বর্তমানের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির খবর রাখেন? শ্রাবন্তীর আক্ষেপ, ‘এখনও আমি সারা পৃথিবীর গান শুনি। যখন এখনকার বাংলা গান শুনি, কষ্ট হয়। আমাদের শিল্পীরা কোনও এক্সপোজারই পাচ্ছেন না। এফ এম চ্যানেলগুলো নতুন বাংলা গান বাজায় না।’
প্যাশনের গল্প
একদা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার বলেছিলেন, ‘শ্রাবন্তী দশ বছর এগিয়ে আছে’। কিছুটা পিছিয়ে শ্রাবন্তীর জবাব, ‘আমি কোনও দিন মিডিয়া বা হিট-ফ্লপ মাথায় রেখে গান করিনি। উদ্যোগ আর প্যাশন নিয়ে গেয়েছি। সেজন্য গানের জগতে আমাকে সবাই স্নব বলত।’
মেয়ের গল্প
শ্রাবন্তী আজও শ্রোতাদের চেনা ‘খুকু’। স্মৃতিমেদুর শিল্পী বললেন, ‘হেমন্তদা ছাড়া এই গান হয় না।’ টপ্পা অঙ্গে শ্রাবন্তী রবীন্দ্রনাথের গান শিখেছেন মায়া সেনের কাছে। সুপ্ত ইচ্ছের কথা বললেন, ‘সেই গান গাওয়ার আমার খুব ইচ্ছে আছে। আমি অন্য ধরনের গান করি বলে তখন কেউ আমার রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করতে চায়নি।’ শ্রাবন্তীর মতে, ‘দিন পাল্টেছে। এখন শুধু একটা এসরাজ নিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত কেউ শুনবে না। আমি একটা গিটার নিয়েও গাইতে পারি। কিন্তু যন্ত্রানুষঙ্গ যেন গানটাকে ছাপিয়ে না যায়।’
প্রিয়ব্রত দত্ত
ছবি: দীপেশ মুখোপাধ্যায়