


জীবাত্মা ও পরমাত্মার অভিন্নতাই বৈদিক জ্ঞানের সার কথা। চারটি বেদের প্রতিটিতে এই জ্ঞানসূচক একটি করে মহাবাক্য আছে। নির্গুণ ব্রহ্মের সঙ্গে জীবাত্মার অভিন্নতার কথা বলা হয়েছে—মন এবং বাক্যের অতীত পরম সত্তার সঙ্গে নয়।
ঋগ্বেদের ঐতরেয়োপনিষদে মহাবাক্য হল—“প্রজ্ঞানম্ ব্রহ্ম” অর্থাৎ জীবের অন্তর্নিহিত চৈতন্য ব্রহ্মের সঙ্গে অভিন্ন।
যজুর্বেদের বৃহদারণ্যকোপনিষদে মহাবাক্য হল—“অহং ব্রহ্মাস্মি” (জীবের অন্তরতম আত্মাই নির্গুণব্রহ্ম)।
সামবেদের ছান্দোগ্যোপনিষদে মহাবাক্য হল—“তত্ত্বমসি”। ঋষি উদ্দালক তাঁর পুত্র শ্বতকেতুকে শিখিয়েছেন—জগতের সমস্ত কিছুতে এক আত্মা, সর্বব্যাপী চৈতন্য অনুস্যুত। সুতরাং প্রতিটি জীব স্বরূপতঃ সেই আত্মা।
অথর্ববেদের মাণ্ডুক্যোপনিষদে মহাবাক্য হল—“অয়মাত্মা ব্রহ্ম”। জীবের অন্তরতম আত্মা স্বরূপতঃ অদ্বয়চৈতন্য।
এই মহাবাক্য দুই প্রকার জ্ঞান সঞ্চার করে—যা অন্য কোন উপায়ে পাওয়া যায় না। প্রথম পক্ষে—আত্মাকে ব্রহ্মরূপে নির্দেশ করে এটি মানুষের নিজের সম্বন্ধে দৃঢ়মূল ভ্রান্তধারণার নিরসন করে। সে ভাবে সে বদ্ধ, সীমিত অপূর্ণ এবং মরণশীল। মহাবাক্য তার আসল স্বরূপ নির্দেশ করে বলে, সে স্বয়ং বিদ্যমান, স্বয়ং-জ্যোতি, সদা-শুদ্ধ, সদা-মুক্ত। অপর পক্ষে ব্রহ্মকে আত্মারূপে নির্দেশ করে এটি পরম সত্তা সম্পর্কে মানুষের অনুরূপ অদম্য ভ্রান্তধারণা নিরসন করে। তিনি দূরে, অপ্রাপ্য, লুক্কায়িত, হয়ত বা অস্তিত্বহীন এই ধারণা দূর করে তাঁকে অন্তরতম সত্তা, সদাপ্রকাশশীল, সন্নিকটস্থ এবং অপরোক্ষরূপে প্রকাশ করে। এইভাবে, যা দূরতম বলে মনে হয় তা নিকটতর থেকে নিকটতম রূপে প্রকাশিত হয়। যা অপ্রাপ্য বলে মনে হয় তো পাওয়া হয়েই আছে, যা চির লুক্কায়িত বলে মনে হয় তা স্বপ্রকাশ।
প্রতিটি মহাবাক্যই জীব-চৈতন্যের সঙ্গে বিশ্ব-চৈতন্য বা সর্বব্যাপী চৈতন্যের অভিন্নতা ঘোষণা করছে এবং একমাত্র সত্য ব্রহ্ম যা অদ্বয়-চৈতন্য তাঁকে নির্দেশ করছে। তাই এই মহাবাক্যকে বলা হয় অখণ্ডার্থবোধক।
এই প্রসঙ্গে আমরা শঙ্করাচার্যের নির্বাণষট্কম্ স্তোত্র স্মরণ করি। এটিকে আত্মষ্টকম্ও বলে
ওঁ মনোবুদ্ধ্যহঙ্কারচিত্তানি নাহং
ন চ শ্রোত্রজিহ্বে ন চও ঘ্রাণনেত্রে।
ন চ ব্যোম ভূর্মিন তেজো ন বায়ু—
শ্চিদানন্দরূপঃ শিবোঽহং শিবোঽহম্।।
আমি মন বুদ্ধি অহঙ্কার ও চিত্ত নই; কর্ণ ও জিহ্বা নই; নাসিকা ও চক্ষু নই; আকাশ ও ক্ষিতি নই, অগ্নি নই, বায়ুও নই; আমি জ্ঞান ও আনন্দস্বরূপ শিব, আমি শিব।
স্বামী সৎপ্রকাশানন্দের ‘ধ্যান সাধনা সিদ্ধি’ থেকে