


চোদ্দ বছর আগে ২০১১ সালে চতুর্দশ দলাই লামা বলেছিলেন, তাঁর ৯০ বছর বয়সে উত্তরাধিকার–সংক্রান্ত প্রশ্নের মীমাংসা হবে। ১৪ বছর পর, চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রকাশিত তাঁর আত্মকাহিনি ‘ভয়েস ফর দ্য ভয়েসলেস: ওভার সেভেন ডিকেডস অব স্ট্র্যাগল উইথ চায়না ফর মাই ল্যান্ড অ্যান্ড মাই পিপল’ বইয়ে দলাই লামা জানিয়ে দেন, পরবর্তী দলাই লামা জন্ম নেবেন চীনের বাইরে। ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসিত সর্বোচ্চ বৌদ্ধ ধর্মগুরু বলেছেন, ৬০০ বছর ধরে তিব্বতি বৌদ্ধরা তাঁদের আধ্যাত্মিক গুরু বাছাই করে চলেছেন। দলাই লামা প্রতিষ্ঠানের সেই ধারাবাহিকতা তাঁর মৃত্যুর পরেও বজায় থাকবে। ২০১১ সালে তিনি যে ট্রাস্ট গঠন করেছেন, যার নাম গাহদেন ফোড্রাং ট্রাস্ট, একমাত্র তারাই তাঁর পুনর্জন্ম বা উত্তরাধিকার শনাক্তকরণের কাজ করবে। এই প্রক্রিয়ায় বাইরের কাউকেই হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া হবে না। তাতেই ক্ষেপেছে বেজিং।
চৈনিক রক্তচক্ষুর প্রতাপে নোবেলজয়ীকে বয়কট করেছে তাঁরই জন্মভূমি। লাসার পাটোলা মনাস্ট্রি-তে বাকি তেরো জন দলাই লামার ঠিকুজি-ঠিকানা, স্বর্ণলেপিত তাম্রমূর্তি সাড়ম্বরে বিরাজিত। চতুর্দশ দলাই লামার ছিটেফোঁটা উল্লেখও নেই। অথচ, তিনি ভারতের ধর্মশালায় যাওয়ার আগে এখানেই ছিলেন। অকথ্য অত্যাচারেও ধর্মের উপর রাষ্ট্রতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেননি। প্রায় ছ’দশক আগে চীন অধিকৃত তিব্বত থেকে গোপনে ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন চতুর্দশ দলাই লামা। তখন বয়স মাত্র ২৪! চীনের লাল ফৌজের হাত থেকে বাঁচতে তিব্বতের লাসা থেকে সেনার ছদ্মবেশে সেদিন বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনি। দু’দিন দু’রাত পায়ে হেঁটে, ব্রহ্মপুত্র নদ পেরিয়ে, দুর্গম হিমালয়ের বাধা টপকে ভারতে পৌঁছেছিলেন ১৯৫৯ সালের ১৭ মার্চ। তাঁর সঙ্গেই চীন-অধিকৃত তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন পরিজন ও অনুগামীরা। হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালা-সহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ঠাঁই পেয়েছিলেন কয়েক হাজার তিব্বতি বৌদ্ধ। আর তারপর ধর্মশালা থেকেই দীর্ঘ আট দশক ধরে অবরুদ্ধ এক জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন দলাই লামা। তাঁর জন্য জন্মভূমির দরজা চিরতরে ‘রুদ্ধকপাট’, হয়তো গণঅভ্যুত্থানের ভয়ে। তাঁর খবর-বক্তৃতা তিব্বতে সম্প্রচারে অনেক বাধানিষেধ। ২০১৯ সালে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চতুর্দশ দলাই লামা তেনজিং গ্যাৎসো জানিয়েছিলেন, চীন বা চীন-অধিকৃত তিব্বত নয়, তাঁর উত্তরসূরি মনোনীত হবেন ভারত থেকেই। তারপরেই বৌদ্ধধর্মের সর্বোচ্চ গুরুর কুর্সি ঘিরে তৎপরতা বাড়িয়েছে একদলীয় চীনের কমিউনিস্ট শাসকবর্গ। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, চীন সরকারও পাল্টা বেছে নেবে পঞ্চদশ দলাই লামাকে। ঠিক যেভাবে তারা ১৯৯৫ সালে চতুর্দশ দলাই লামার পছন্দের পাঞ্চেন লামাকে অপহরণ করে বেছে নিয়েছিল তাদের পছন্দের পাঞ্চেন লামাকে। দলাই লামার পর তিব্বতি বৌদ্ধদের কাছে পাঞ্চেন লামাই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক গুরু। আজও পাঞ্চেন লামার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম।
স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক নয়াদিল্লি। ভারতের দৃষ্টিতে চতুর্দশ দলাই লামা এক ধর্মগুরু। তিনি ও তাঁর অনুগামী যাঁরা ভারতে রয়েছেন, তাঁরা কেউই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন। ভারত বরাবরই বিশ্বাস করে এবং বারবার সে কথা বলেও এসেছে, উত্তরাধিকার বাছাইয়ের প্রাচীন ঐতিহ্য দলাই লামারই। এই পরম্পরায় তৃতীয় কোনও পক্ষের হাত কখনও ছিল না, থাকা উচিতও নয়। সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে ভারত সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এ কথা মানতে নারাজ বেজিং। কমিউনিস্ট চীনের কাছে দলাই লামা গলার কাঁটা। ভারতে অবস্থানকারী দলাই লামা ও তিব্বতিদের নির্বাসিত সরকার তাদের কাছে বিশেষ স্পর্শকাতর। কমিউনিস্ট চীন শুরু থেকেই চায় দলাই লামার উত্তরসূরি নিয়ন্ত্রণ করতে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যেভাবে ‘সোনালি পাত্র’ থেকে পরবর্তী দলাই লামার নাম তোলা হতো, চীন চায় সেভাবেই তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে বেছে নিতে। সেই কারণে তারা বারবার বলে আসছে, দলাই লামার মনোনয়ন তাদের অনুমোদন পেতে হবে। চতুর্দশ দলাই লামা ও ভারতে অবস্থানরত তিব্বতি জনগণ তা মানতে রাজি নন। ফলে দলাই লামা তাঁর ৯০তম জন্মদিনে উত্তরসূরি বেছে নিলে চীন–ভারত রেষারেষি নিশ্চিতভাবেই তীব্রতর হবে। ৬ জুলাই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজই ৯০-এ পা রাখবেন দলাই লামা। কোনও অঘটন না ঘটলে আজই উত্তর ভারতের হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালার ম্যাকলয়েডগঞ্জে তাঁর উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার কথা। আত্মপ্রকাশ ঘটবে পঞ্চদশ দলাই লামার। বৌদ্ধ ধর্মগুরু হিসেবে পঞ্চদশ দলাই লামার নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে ভারত–চীন রেষারেষির নতুন এক অধ্যায়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও এক নতুন খাতে বইতে শুরু করবে। আর অহিংস তিব্বতিরা বিড়বিড় করবে উচ্চারণ করবে ‘ওঁ মণিপদ্মে হুম’।