Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নজিরবিহীন পদক্ষেপ

ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার অনেক কারণ থাকে। ভারতের দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন টিএন শেষন, যিনি নির্বাচন ব্যবস্থায় কঠোর সংস্কার, সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা এবং নির্বাচনি আচরণ বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

নজিরবিহীন পদক্ষেপ
  • ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার অনেক কারণ থাকে। ভারতের দশম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন টিএন শেষন, যিনি নির্বাচন ব্যবস্থায় কঠোর সংস্কার, সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা এবং নির্বাচনি আচরণ বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করে আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। ভারতের বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকেও লোকে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গবাসী অবশ্য অন্য কারণে বহুকাল মনে রাখবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর নামে তিনি এক ‘অভূতপূর্ব অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন! এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালত যে বেনজির নির্দেশ দিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে তা নজিরবিহীন হিসাবেই লেখা থাকবে। ১৯৫২ সালে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে এবার নিয়ে অষ্টমবার এসআইআর হচ্ছে। কিন্তু কোনো একটি নির্বাচিত রাজ্য সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির ফয়সালা করতে বিচার বিভাগের আধিকারিক কিংবা জেলা বিচারকদের কাঁধে দায়িত্ব তুলে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট— এমন উদাহরণ নেই। এই নির্দেশ প্রমাণ করে, বাংলায় এসআইআর-এর কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রকাশের কাজে নিদারুণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। আদালতের পদক্ষেপে সংগত কারণেই নিজেদের ‘জয়’ দেখছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। 

Advertisement

এই নির্দেশের পিছনে বিরোধের ফয়সালা না হওয়ার কারণ খুব পরিষ্কার। তথ্যগত অসংগতি বা লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির কারণে রাজ্যের দেড় কোটির বেশি ভোটারকে শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। সেই শুনানিপর্ব শেষ হলেও রাজ্য-কমিশন বিরোধ থেকেই গিয়েছে। কেন? নিয়মমতো, এসআইআর-এর কাজে কর্মরত প্রত্যেকেই নির্বাচন কমিশনের আয়ত্তাধীন। এই বিপুল কর্মযজ্ঞে যাঁরা ইআরও-র ভূমিকায় রয়েছেন, তাঁরা আদতে রাজ্য সরকারের আধিকারিক। আইন অনুযায়ী, তাঁদের হাতেই যোগ্য-অযোগ্য যাচাই করে চূড়ান্ত ফয়সালা করার ক্ষমতা রয়েছে। অভিযোগ ওঠে, নথি পুনরায় যাচাইয়ের কথা বলে ইআরওদের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে মাইক্রো অবজার্ভার ও স্পেশাল রোল অবজার্ভারদের একাংশ। এই দুই শ্রেণির সরকারি অফিসারদের ভিন রাজ্য থেকে তুলে এনে এখানে দায়িত্ব দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেখানেই সংঘাতের সূত্রপাত। এই দুই পক্ষের বিরোধের জেরে প্রায় ৫৬ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য নিয়ে দড়ি টানাটানি চলছে। ফলে তৈরি হয়েছে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির এই জটিলতা নিরসনেই হাইকোর্টের অধীনে বিচার বিভাগীয় অফিসার নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে কে ভোটার থাকবেন, কে নয়— তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন এঁরাই। অর্থাৎ কমিশনের এক্ষেত্রে আর কোনো ভূমিকা থাকল না। 
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে শুরু থেকেই মমতা সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। রাজ্যের ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ভোটারের নিবিড় সংশোধন কী করে মাত্র কয়েকমাসে সম্ভব, সেই প্রশ্ন উঠেছিল। ঘটনাও হল, এই তাড়াহুড়োর ফলে শুনানিপর্বে নাগরিকদের চূড়ান্ত মাত্রায় হেনস্তা করা হয়েছে। নাম-পদবির সামান্য হেরফেরের কারণে ভোটারদের হয়রান করা হয়েছে। প্রতি পদে পদে দক্ষতা ও পরিকল্পনার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও বহু ক্ষেত্রে বৈধ নথি নিতে অস্বীকার করা হয়েছে বলে অভিযোগও ওঠে। এই কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারার আশঙ্কায় শতাধিক প্রকৃত ভোটারের মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ। আর সীমাহীন কাজের চাপ ও কমিশনের তুঘলকি নির্দেশে একাধিক বিএলও-র প্রাণ গিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এহেন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বহু ভোটার। সর্বশেষ লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে স্পেশাল রোল অবজার্ভার ও মাইক্রো অবজার্ভারদের দিয়ে বৈধ ভোটারদের নাম কেটে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলে শাসক দলের তরফে অভিযোগ করা হয়। কমিশনের এই সংশয়ী ভূমিকায় শাসকের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়, ‘বিজেপিকে’ সুবিধা করে দিতেই কমিশন ‘ব্যাট’ ধরেছে কি না তা নিয়েও। বিজেপির পালটা অভিযোগ, অন্যান্য রাজ্যে এসআইআর-এর কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলেও যত কাণ্ড এই পশ্চিমবঙ্গেই ঘটে চলেছে! কথাটাও সম্পূর্ণ ভুল নয়। তবে এর প্রধান কারণ—বিহার, গুজরাত সহ বিজেপি শাসিত রাজ্যে দুই তরফের ‘কমন ইন্টারেস্ট’ থাকায় এসআইআর নিয়ে হয়তো কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তা সম্ভব হচ্ছে না। রাজনীতিবিদদের একাংশের মতে, এসআইআর-এর নামে যখনই ‘অগণতান্ত্রিক’, ‘একতরফা’ পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন, রাজ্যের শাসক দল চোখে চোখ রেখে তার চ্যালেঞ্জ করছে। মাঠ-ময়দানের সেই চ্যালেঞ্জ পৌঁছে গিয়েছে আদালতে। তাই ঢোক গিলে এখন সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মানতে বাধ্য কমিশন। বাংলায় প্রবাদ আছে শঠে শাঠ্যং। জ্ঞানেশ কুমার নিশ্চয়ই তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। তবে গণতন্ত্র রক্ষার্থে সুপ্রিম নির্দেশে বৈধ ভোটাররাও আশার আলো দেখছেন। কারণ, নাগরিকদের সবচেয়ে বড়ো ভরসার জায়গা তো ভারতের বিচার ব্যবস্থা। তাঁরা ভাবেন, আদালত নিশ্চয়ই ন্যায়বিচার দেবে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ