সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: সামনের উঠোনে বর্ষার জল জমে রয়েছে। তার মধ্যে মাথা তুলেছে আগাছা। এক সময় যে বাড়ির পুজো ঘিরে আলো-আয়োজনের শেষ থাকত না, আজ শ্রীরাম ঢ্যাং রোডের সেই সালিখা হাউসের গায়ে সময়ের ক্লান্তির ছাপ। তবু পুজো আসছে বলে নিস্তব্ধ ঠাকুরদালানে শুরু হয়েছে ব্যস্ততা। গড়া হচ্ছে প্রতিমা। মাটি, কাঠামো আর পুরানো দেওয়ালের গন্ধের মধ্যেই যেন হঠাৎ উসকে ওঠে এক পুরানো স্মৃতি। এই ঠাকুরদালানে বসেই বাড়ির অন্যতম সদস্য বিখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনের শেষ পুজো অ্যালবামের জন্য লিখেছিলেন, ‘আমায় একটু জায়গা দাও মা, মন্দিরে বসি।’ প্রায় ২৮০ বছরের দুর্গাপুজোর সঙ্গে এই বাড়ির ইট-কাঠের মতো মিশে রয়েছে পুলকের স্মৃতিও।
ব্রিটিশ আমলে জমিদার রাধামোহন বন্দ্যোপাধ্যায় তৈরি করেছিলেন এই সালিখা হাউস। পরে রসিককৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করেন দুর্গাপুজো। ব্যানার্জি বাগানের জমিদারির সুবাদে এক সময় এই ভিটের পরিচয় ছিল ‘বাবুদের বাড়ি’ নামে। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয়ের জৌলুস অনেকটাই মুছে গিয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও ছড়িয়ে পড়েছেন নানা প্রান্তে। এখন এই বাড়িতে রয়েছেন নবম প্রজন্মের সুস্মিত বন্দ্যোপাধ্যায়। বংশের এই প্রজন্মের একমাত্র সদস্য হিসাবে তাঁর কাঁধেই এসে পড়েছে এত বছরের পুজোর ভার। সুস্মিতবাবুর মুখে মুখেই যেন খুলে যায় সালিখা হাউসের পুজোর পুরানো খাতা। জন্মাষ্টমীর দিন থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। সেদিনই কাঠামোয় মাটি পড়ে। মহালয়ার পরের দিন থেকে শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। ষষ্ঠীতে গৃহদেবতা নারায়ণ ও মঙ্গলচণ্ডীকে নিয়ে আসা হয় ঠাকুরদালানে। সপ্তমীতে বাঁড়ুজ্জে ঘাটে কলাবউ স্নান। অষ্টমীতে সন্ধিপুজোর পাশাপাশি হয় কুমারী পুজো ও সধবা পুজো। নবমীতে আখ, ছাঁচি কুমড়ো ও শশা বলির রীতি রয়েছে। পুজোর ভোগেও বদল আসেনি বিশেষ। খিচুড়ির সঙ্গে থাকে পাঁচ রকম ভাজা, ফ্রাইড রাইস, চালতা দিয়ে মসুর ডাল, ফুলকপির ডালনা, তেঁতুলের চাটনি, পায়েস, মিষ্টি ও বোঁদে। দশমীতে পান্তা ভোগ খেয়ে বিদায় নেন মা। ভোগে থাকে কামিনী আতপের ভাত, কচুশাক, পুঁইশাকের তরকারি এবং ল্যাটা মাছ পোড়া। সিঁদুর খেলার রীতি অবশ্য নেই এই বাড়িতে।
‘পুজোর চারটি দিন অবশ্য পুরানো বাড়িটা আবার নিজের চেহারা ফিরে পায়। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজন এলে ভরে ওঠে ফাঁকা ঘরগুলি।’ বলতে বলতেই সুস্মিতবাবুর চোখ চলে যায় ঠাকুরদালানের বাঁদিকে দোতলার এক বন্ধ জানালার দিকে। ওই ঘরেই থাকতেন তাঁর কাকা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে বসে লিখেছেন কত কালজয়ী গান। সুস্মিতবাবুই জানালেন, পুজোর সময় এই বাড়িতে আসতেন উত্তম কুমার, মান্না দে সহ বহু গুণী মানুষ। বসত গানের আসর। এই বাড়িতে গান গেয়েছেন অপরেশ লাহিড়ী, তবলা বাজিয়েছেন বাপি লাহিড়ী। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকালমৃত্যুর পর পুজোর জৌলুসও নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছে। এখন পুজো শেষ হলেই গোটা বছর খাঁ খাঁ করে সালিখা হাউস। আর জীর্ণ ঠাকুরদালানে থেকে যায় পুলকের সেই অমর প্রার্থনার প্রতিধ্বনি— ‘আমায় একটু জায়গা দাও মা।’ নিজস্ব চিত্র