রাঢ় বাংলায় সভ্য সংস্কৃতির সমান্তরালে কয়েকশো বছর ধরে বহমান নানা লোক উৎসব। নানা রীতি, আচার, অনুষ্ঠান, লোকগানে অনন্য সেই উৎসবগুলি। এরকমই একটি উৎসব টুসু। এর সঙ্গে জড়িয়ে রাঢ়ের মানুষের রুক্ষ জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মিলন-বিরহ গাথা। কোনও বৈদিক আচার অনুষ্ঠান নয়। টুসুর রীতি নীতি একেবারেই গ্রামবাংলার নিজস্ব। কৃষি প্রধান এলাকায় আশপাশে ছড়িয়ে থাকা উপকরণ দিয়েই হয় টুসু পুজো। আর এরপরই টুসু গান। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে ইতু বিসর্জন দিয়ে মাটির তৈরি নতুন খোলায় ধানের তুষ ও গাঁদা ফুল দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করা হয় টুসু খোলা। এরপর গোটা পৌষমাস এর পুজো চলে। এখন অবশ্য দোকান থেকে কিনে আনা হয় টুসু মূর্তি। টুসু এক লৌকিক দেবী, যাঁকে কুমারী হিসেবে কল্পনা করা হয়। তাই প্রধানত কুমারী মেয়েরাই টুসুপুজো করে থাকেন। পৌষ সংক্রান্তির আগের রাত হল টুসু পুজোর রাত। ফল, পিঠে, খই-মুড়কির নৈবেদ্য সাজিয়ে টুসুর পুজো করেন কুমারী মেয়েরা। ওইদিন রাতভর গান শুনিয়ে জাগিয়ে রাখা হয় টুসুমনিকে। শীতের রাতে দূর দূরান্ত থেকে শোনা যায় সেই গানের মাদকতাময় সুর। পরদিন গান গাইতে গাইতে নিকটবর্তী নদী বা জলাশয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় আদরের টুসুকে। পৌষ সংক্রান্তির ভোরবেলায় টুসুর এই বিসর্জনও এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। মেয়েরা একসঙ্গে গান গাইতে গাইতে টুসু দেবীকে বাঁশ বা কাঠের তৈরি রঙিন কাগজে সজ্জিত দোলায় বসিয়ে নদী বা পুকুরে বিসর্জন দেন। টুসু মূলত আদিবাসীদের অনুষ্ঠান। তবে অনুষ্ঠানের সময় ভেসে যায় আদিবাসী-মূলবাসী ভেদরেখা। টুসুর প্রচলন রয়েছে পুরুলিয়া,ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলায়।



