অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: খাসজমি, পুকুর দখল করার পর তা প্লট করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে অবাধে। পুকুর ভরাট করে বিক্রি হয়েছে। সেখানে আবাস যোজনা প্রকল্পে দ্বিতল টাইলস বসানো পেল্লাই বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে৷ কাটোয়ার মূলগ্রামে প্রভাবশালী এক তৃণমূল নেতাকে প্রণামী দিলেই মিলত এসব বেআইনি কাজের ছাড়পত্র। পালাবদলের পর ধীরে ধীরে ফাঁস হচ্ছে ওই নেতার কীর্তিকলাপ। যা নিয়ে বেজায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। তার চেয়েও বড় কথা, যাঁরা পাট্টা পাওয়ার লোভে খাসজমি কিনেছেন, তাঁরা এখন চরম বিপাকে। মূলগ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকায় বহু খাসজমি প্লট করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। কারও কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে কাঠা পিছু নেওয়া হয়েছে৷ আবার কারও কাছ থেকে তিরিশ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। ওই টাকায় নাকি তৃণমূলের পার্টি অফিস গড়ে তোলা হয়েছে। খাসজমির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত পুকুর পর্যন্ত ভরাট করা হয়েছে৷ অভিযোগের আঙুল উঠেছে মূলগ্রামের একদা প্রভাবশালী দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী তৃণমূল নেতা সুশীল ঘোষের দিকে। তাঁর সহযোগী খগেন্দ্র ঘোষ, নিখিল ঘোষ, দয়াময় দত্তও দেদার টাকা তুলেছেন। সেই টাকার বড় অংশ দিয়ে তৈরি হয়েছে পার্টি অফিস।
তৃণমূল নেতা সুশীলবাবু অপকটে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি এদিন বলেছেন, ‘পার্টির জন্য ডোনেশন নেওয়া হয়েছিল। ওই টাকায় আমরা পার্টি অফিস তৈরি করেছি।’ মূলগ্রামের বাসিন্দারা জানান, গ্রামে প্রাথমিক স্কুলের পিছনেই সাত বিঘা খাসজমি, পুকুর রয়েছে। ধীরে ধীরে কয়েক বছর ধরে তা বিক্রি করে দেওয়া হয় একাধিক লোককে। এখন ওই এলাকায় চল্লিশটি পরিবার বসবাস করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জনের কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে আদায় করেছে সুশীলবাবু ও তাঁর সহযোগীরা। গ্রামের বাসিন্দা মহাদেব দাসকে এক কাঠা জমি দিয়ে নেওয়া হয় তিরিশ হাজার টাকা। মহাদেব পরে আড়াই কাঠা জায়গা দখল করে নেন। পরে মহাদেবকে আবাস প্রকল্পে একটি বাড়ি পাইয়ে দেওয়া হয়। এখন মহাদেবের বাড়ি রীতিমতো দ্রষ্টব্য হয়ে উঠেছে এলাকায়। দ্বিতল পেল্লাই বাড়ি। টাইলস বসানো ঝাঁ চকচকে। দেখলে কেউ বলতেই পারবেন না, ওই বাড়ি আবাস প্রকল্পের। মহাদেব বলছিলেন, ‘আমাকে তিরিশ হাজার টাকায় পুকুরের একাংশ দিয়েছিলেন ওই তৃণমূল নেতা। আমি পুকুর বুজিয়ে বাড়িটি তৈরি করেছি৷ আবাস প্রকল্পেই দেওয়া হয়েছিল বাড়িটি। কিন্তু, আমার দুই ছেলে ভিনরাজ্যে থাকে। তাই বাড়িটি এখন দ্বিতল করা হয়েছে।’ এলাকার বাসিন্দা শ্যামল দাস, সুবোধ দাস, উজ্জ্বল মাঝিদের কথায়, ‘আমাদের কাছ থেকে তৃণমূল নেতা সুশীলবাবু ১২ হাজার টাকা করে নিয়েছেন৷ তার বিনিময়ে পাট্টা পাইয়ে দেব বলে খাস জমিতে থাকতে দিয়েছেন। এখন পাট্টা তো দূরে থাক। টাকাটাও ফেরত দিচ্ছেন না। চাইতে গেলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সুশীলবাবু দু’টি বাসের মালিক। তৃণমূল জমানায় তাঁর দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। অতিষ্ট ছিলেন গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁরা বলছেন, ২০২১ সালের পর গ্রামে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের উপর লাগাম ছাড়া অত্যাচার করেছিলেন সুশীলবাবু। গ্রামে তোলাবাজি করতেন নিয়মিত। এখন টাকা চাইতে গেলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। মূলগ্রামের বাসিন্দা তথা বিজেপির কাটোয়া জেলা কমিটির সদস্য মানব ঘোষ বলেন, ‘খাসজমি বিক্রি করে দিয়েছিলেন ওই তৃণমূল নেতা। আমরা চাইছি প্রশাসন সঠিক তদন্ত করে কড়া ব্যবস্থা নিক।’
খাস জমির উপর আবাস প্রকল্পের পেল্লাই বাড়ি।