


সুখেন্দু পাল, কাটোয়া: কাটোয়া শহরের মাধবীতলা। সোমবার সাত সকালে একটি ডালপুরির দোকানে বেশ ভিড়। কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটছে তেল। একটা পর একটা ডালপুরি তাতে ফেলছেন। নেড়েচেড়ে তুলে নিচ্ছেন। মুখে শুধু হরিনাম। কারিগর বিন্দাস। ফুরফুরে মেজাজে ক্যাশবাক্স সামলানো ব্যক্তি থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশনকারী কর্মীরাও।
গঙ্গার পাড়ে মেজাজি আড্ডা মারছেন কয়েকজন যুবক। সম্ভবত, প্রাতঃভ্রমণে এসেছিলেন। চায়ের ঠেকে খানিক রাজনীতির তুফান তুলে ঘরে ফিরবেন। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলেন, বছর তিনেক আগে গঙ্গার পাড় এত শান্ত ছিল না। ছিল দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল। ভয়ে এ পথ মাড়াতেন না কেউই।
কাটোয়া ভক্তিবাদ আন্দোলনের পীঠস্থান। সেখানে ডালপুরির দোকানের কারিগর হরিনাম গাইবেন, গঙ্গার পাড়ে শান্তির পরিবেশ বিরাজ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, টানা বেশ কয়েক বছর এই প্রাচীন শহরের ঐতিহ্য দুমড়েমুচড়ে দিয়েছিল একজনই—জঙ্গল শেখ। নামের সঙ্গে সার্থকতা বজায় রেখে গোটা শহরে কায়েম করেছিল জঙ্গলরাজ! তাই হয়তো ডালপুরি খেতে খেতে এক ক্রেতা বলছিলেন, ‘এভাবে খোশ মেজাজে ব্যবসা করার পরিবেশটাই তো ছিল না। কখন জঙ্গলের গ্যাং হাজির হবে, তা কেউ জানতেন না! তোলা নিয়ে দিয়ে ব্যবসা করা দায় ছিল। ওরা পুরো শহরটাকেই সন্ত্রস্ত্র করে রাখত। গ্যাংয়ের ছেলেরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দাপিয়ে বেড়াত। বোমা-গুলি-রক্তপাত, গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল এলাকাবাসীর। সেদিন আর নেই।’ একটু থেমে তিনি আবারও বললেন, ‘আজকের এই শান্ত পরিবেশ তৈরির পুরো কৃতিত্বটাই অবশ্য শাসক দলের। শুধু আমি নই, তৃণমূলের অতি বড় নিন্দুকও একবাক্যে এ কথা মানবেন।’
গঙ্গার পাড়ে জোট-আড্ডার শরিক অর্ঘ্য দাস। কাটোয়া শহরেই বাড়ি। কথায় কথায় তিনি বলছিলেন, ‘মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। ক’বছর ধরে কাটোয়ায় দঙ্গল নিয়ে জঙ্গলরাজ চালাচ্ছিল জঙ্গল। লোকে বাড়ির বাইরে বেরোতে ভয় পেতেন। এখন সেই আতঙ্ক নেই।’ শহরের দু’একটি চায়ের ঠেক অবশ্য বলছিল অন্যকথা। জঙ্গল গ্যাংয়ের বাড়বাড়ন্ত তৃণমূলের জমানাতেই হয়েছিল। পুরভোটে তার গ্যাং শহরে যেভাবে দাপট দেখিয়েছিল, তা দক্ষিণী সিনেমার চিত্রনাট্যকেও লজ্জা দেবে। শেষে শাসক দলই তাকে শিক্ষা দিয়ে শ্রীঘরে পাঠিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বার্তা দিয়েছে।
এবার ভোটে সেই সুশাসনই তৃণমূলের ভোট-ভিত্তি। সঙ্গে উন্নয়নের ঢালাও কর্মযজ্ঞ তো রয়েইছে। যা অকপটে স্বীকার করেন শহরবাসী। শহর সংলগ্ন শ্রীবাটি, গোয়াই, সুদপুর, গাজীপুর সহ সব এলাকাতেও উন্নয়নের ছোঁয়া। গ্রামের রাস্তা ঢালাই হয়েছে। পানীয় জলের সমস্যা মিটেছে। শুধু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র আর সেতু না হওয়ার আক্ষেপ কারও কারও গলায়। স্বয়ং সিপিএম প্রার্থী সিপিএম সঞ্জীব দাসও বলছেন, ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে এলাকার ভোল বদলে যেত।’
যদিও ভোটে সেই আক্ষেপ খুব একটা প্রভাব ফেলবে না বলে মত তৃণমূলের। দলের প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রচার-যুদ্ধে এগিয়ে। বিজেপি-কংগ্রেস এখনও প্রার্থীই ঘোষণা করতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথের সামনে ফাঁক মাঠ। উন্নয়নের ভিড়ে দাঁড়িয়ে জঙ্গলরাজের অবসান ঘটানোর চওড়া হাসি তাঁর মুখে। হাসছে শ্রীচৈতন্যের পদধূলি ধন্য কাটোয়া। সবার মুখে হরিনাম।