


সংবাদদাতা, কাটোয়া: সত্তর-আশির দশকের বিয়েবাড়ি মানেই শালপাতার থালায় গরমাগরম ভিন্নস্বাদের রকমারি পদে উদরপূর্তি। এ-যেন এক আলাদাই অনুভূতি! তবে, বর্তমানে থার্মোকল ও কাগজের প্লেটের দাপটে সেসব এখন অতীত। জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের এখন আর শালপাতা কুড়িয়ে সংসার চলে না। আউশগ্রামে একসময় বনদপ্তরের তরফে গড়ে তোলা শালপাতার প্লেট তৈরির কারখানাগুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বহু শ্রমিক পেশা বদল করেছেন। সংসারের জোয়াল টানতে কেউ দিনমজুরি, কেউবা অন্যের দোকানে কাজ করছেন। মহিলারা কৃষিকাজে ফিরে গিয়েছেন। আর বন্ধ কারখানাগুলিতে লক্ষাধিক টাকার মেশিন পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এহেন অসম বাজারে টিকে থাকতে আদিবাসীরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইছেন।
পূর্ব বর্ধমান জেলা ডিএফও সঞ্চিতা শর্মা বলেন, আমি সংশ্লিষ্ট রেঞ্জারদের সঙ্গে কথা বলে উদ্যোগ নেব।
জঙ্গলে শালপাতা কুড়িয়েই একটা সময় আদিবাসীদের সংসার চলত। শালপাতার থালা তৈরি করে বাজারে জোগান দিতে গিয়ে তাঁরা হিমশিম খেতেন। আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিতে আদিবাসীদের জন্য উন্নত প্রযুক্তির মেশিনের বন্দোবস্ত করেছিল বনদপ্তর। আউশগ্রামের ভাল্কি অঞ্চলের ডোমবাঁধি ও অমরপুর অঞ্চলের আমজুরুলিয়া এলাকায় বনদপ্তর শালপাতা তৈরির দু’টি কারখানা গড়ে দিয়েছিল। উদ্দেশ্য, গতানুগতিক ধারা বদলে শালপাতার থালায় একটু সৌন্দর্যায়ন ঘটানো। পাশাপাশি, স্থানীয় আদিবাসীদের কর্মসংস্থান গড়ে তোলা। সেইমতো বনদপ্তর বনসুরক্ষা কমিটির লোকজনকে নিযুক্ত করেছিল। ২০১৯-’২০ অর্থবর্ষে কারখানা দু’টি গড়ে তোলা হয়। সেলাই মেশিন, প্লেট তৈরির মেশিন বসানো হয়। বহু মানুষ সেখানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু কারখানাগুলি এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
আদিবাসীরা বলেন, শালপাতার থালা বিক্রি করে তৈরির খরচটুকুও ওঠে না। তারচেয়ে অনেক কম দামে বাজারে থার্মোকল কিংবা কাগজের প্লেট বিক্রি হয়। তাই শালপাতার প্লেটের কদর কমেছে। দু’হাজার পিস শালপাতা জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করতে ৮০০টাকা মজুরি দিতে হয়। সেলাই বাবদ খরচ হয় ১৩০টাকা। মেশিনে প্লেট তৈরি করতে মজুরি দিতে হয় ১০০টাকা। এছাড়া, জঙ্গল থেকে পাতাবোঝাই টোটো ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ আরও ১০০টাকা খরচ হয়ে যায়। সবমিলিয়ে দু’হাজার পিস শালপাতার থালা তৈরিতে খরচ পড়ে ১১৩০টাকা। আর বাজারে তা বিক্রি করে আদিবাসীরা পান ৭৫০ থেকে বড়োজোড় ৯৫০টাকা। তাই লোকসান করে আর কেউ কারখানা চালাতে রাজি নন।
ডোমবাঁধি গ্রামের বাসিন্দা বৈদ্যনাথ টুডু বলছেন, লোকসান করে কারখানা চালানো সম্ভব নয়। বনদপ্তর কলকাতায় মার্কেটিংয়ের ব্যবস্থা করে দিলে আমাদের জীবিকাটা টিকিয়ে রাখা যেত। স্থানীয় সুজাতা কোঁড়া, রবিনা কিস্কু বলেন, জঙ্গলের ঐতিহ্য শালপাতার আবেগ এখন আর নেই। একসময় পাতা কুড়িয়েই আমরা সংসার চালাতাম। ক্রেতারা এখন ৪৫০-৬০০টাকা দরে থার্মোকল কিংবা কাগজের প্লেট পেয়ে যাচ্ছেন। শালপাতার থালা এখন অতীত হয়ে গিয়েছে।