এই তো জীবন..., ঘোষাল পরিবারের দুর্গাদালানে গান ধরবেন উত্তমকুমার!
  • ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: দুর্গাপুজোর উদ্বোধনে টিনসেল টাউনের গ্ল্যামারের ঝলকানি বাংলার পুরনো কালচার। মাধুরী দীক্ষিত, জয়াপ্রদা, গোবিন্দা বা জ্যাকি শ্রফ— ‘বম্বে’ থেকে উড়ে এসে কাঁচি হাতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ান বহু হিরো-হিরোইন। দেবীদর্শনের সঙ্গে তাঁদের দেখা পাওয়াও দর্শকের উপরি পাওনা। কোন্নগরের ঘোষাল বাড়ির দুর্গাপুজোয় এবার সেই নায়ক নায়িকাদেরই ছড়াছড়ি! তবে একটু অন্য ঢঙে। এবার নবমীর রাতে সেখানে হাজির হচ্ছেন স্বয়ং উত্তমকুমার। সঙ্গে থাকবেন সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়াদেবীদের মতো ডাকসাইটে নায়িকারা। নাচে-গানে তাঁরা মাতিয়ে যাবেন ঠাকুরদালান। তাই ঘোষালদের বাড়ির পুজোয় এবার অন্য হাওয়া।

Advertisement

মহালয়ার সকালে নাটমন্দিরে বসে পুজোর গল্প করছিলেন পরিবারের অন্যতম সদস্য প্রবীর ঘোষাল। বললেন, দেবী আরাধনার সঙ্গে সংস্কৃতির চর্চা আমাদের পরিবারের ঐতিহ্য। একসময় এই বাড়ির নাটমঞ্চে উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খাঁ থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করে গিয়েছেন। পরিবারের সদস্য সত্যেন ঘোষালের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতচর্চার সূত্রে এই বাড়ির সঙ্গে যোগ ছিল বহু খ্যাতনামা শিল্পীর। সেই সংস্কৃতিচর্চাকে অক্ষুন্ন রেখেছি আমরা। এবারও নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে পুজোকে কেন্দ্র করে। তার সঙ্গে উপরি পাওনা মহানায়কের জন্ম শতবর্ষকে মনে রেখে এক নজরকাড়া কোলাজ। এবার আমরা তুলে আনছি বাংলা সিনেমার সোনালি দিনের এমন সব মুহূর্ত, যা দর্শককে পৌঁছে দেবে নস্টালজিয়ার বাসরে। ঘোষালবাড়ির পুজো এবার ৫৭২ বছরে পা দিতে চলেছে। মোঘল আমলে যে শারদীয়ার পথ চলা শুরু, তা ফি বছর সাড়ে ৭০০ টাকা করে পার্বণী আদায় করেছে ইংরেজদের থেকেও। লন্ডন থেকে পুজোর চাঁদা আসত গোরা সাহেবদের হাত ধরে। ইতিহাসের গা ঘেঁষে থাকা সেই পুজোর উপাচার আজও অটুট ঘোষালবাড়িতে। দেবীপক্ষ থেকেই বাড়ির মেয়েরা নেমে পড়েন উৎসবের আঙিনায়। পুজো প্রস্তুতি শুরু হয় জোরকদমে। মহালয়ায় সবাই মিলে নাড়ু তৈরি করেন। আমিষ ও নিরামিষে মিলেই হয় ভোগের আয়োজন। সপ্তমী ও নবমীতে যে ভোগ মাকে নিবেদন করা হয়, তাতে মাছ থাকা ‘মাস্ট’। পরিবারের দেবত্র পুকুর থেকে ধরা হয় সেই মাছ। দশমীতে মাকে বরণ করার আগে ভোগ হিসাবে নিবেদন করা পান্তা ভাত ও ইলিশ মুখে দেন মহিলারা। প্রতিমা নিরঞ্জনের পর বাড়ির সকলে মিলে একযোগে খান মাছ-ভাত। 
পরিবারের সদস্য রিঙ্কু ঘোষালের কথায়, অর্চনা, খাওয়াদাওয়া আর হইচইয়ে আমাদের বাঙালিয়ানা অটুট। এই পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সশরীরে আসতে পারেন না দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকার কারণে। আবার যাঁরা আসেন, তাঁদের নিয়েই পুজোর দিনগুলি জমজমাট থাকে পারিবারিক উৎসবে। তাতে মেশে গান, বাজনা, আবৃত্তি বা নাটকের স্বাদ। নবমীর সন্ধ্যা তাই এই পরিবার তো বটেই, এলাকাবাসীর কাছেও স্পেশাল। এবার সেই আনন্দযজ্ঞে আরও মধু ঢালবেন মহানায়ক। ঠিক কী হতে চলেছে এবার?  পরিবারের সদস্যরা জানালেন, উত্তমকুমারের লিপে অবিস্মরণীয় গানগুলিকেই ফিরে দেখা হবে এবার। কেউ সাজবেন উত্তম, আবার সুচিত্রা -সাবিত্রীদের  নাম ভূমিকায় মঞ্চে উঠবেন কেউ কেউ।  কখনও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে বাঙ্ময় হবে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ তো কখনও চটুল ভঙ্গিমায় মহানায়ক গেয়ে উঠবেন, ‘লোলা লুলু, তোমার বয়স কেন হয় না ষোলো, আমার নাইনটিন...’ অভিনয়, রূপটান, পোশাক পরিকল্পনা, পরিচালনা, সংলাপের যাবতীয় কৃতিত্ব পরিবারের সদস্যদেরই। তাঁদের হাত ধরেই ফিরে দেখা হবে সিলভার স্ক্রিনের সাদা-কালো দিনগুলি। বাঙালির ম্যাটিনি আইডল আরও একবার রোম্যান্টিকতায় ভাসাবেন নবমী নিশি। গ্ল্যামারে, কাব্যে, লাস্যে ভাসবেন নায়িকারা। ঢাকের চমক, ধুনোর সৌরভ, প্রদীপের উজ্জ্বলতা আর মন্ত্রোচ্চরণের পবিত্রতায় মিশবে বাঙালির বিনোদনের বিজয়গাথা। ঘোষালদের মতোই সেই মূর্চ্ছনার প্রতীক্ষায় 
আছে কোন্নগর।